নিজস্ব প্রতিবেদক
কক্সবাজারে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত ‘দারুল আরকাম ইবতেদায়ী মাদ্রাসা’ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও সরকারি অর্থ অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মাঠপর্যায়ে বেশিরভাগ মাদ্রাসায় পাঠদান বন্ধ থাকলেও কাগজপত্রে ভুয়া কার্যক্রম দেখিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীরা বকেয়াসহ মোটা অঙ্কের সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন বলে জানা গেছে।প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় প্রকল্পভুক্ত ১৭টি দারুল আরকাম ইবতেদায়ী মাদ্রাসার অস্তিত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ স্থানে নূরানী, কওমী বা ব্যক্তি মালিকানাধীন বেসরকারি মাদ্রাসায় দারুল আরকামের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
গত কয়েক বছর প্রকল্পের কার্যক্রম স্থবির থাকার সুযোগে কিছু শিক্ষক ও অফিস সহায়ক কোনো দায়িত্ব পালন না করেই সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে ভুয়া প্রতিবেদনের মাধ্যমে বকেয়া বেতন তুলে নিয়েছেন। বিশেষ করে টেকনাফ, মহেশখালী, উখিয়া, কুতুবদিয়া, ঈদগাঁও ও রামু উপজেলায় এসব জালিয়াতি আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে।সরেজমিনে ঈদগাঁও উপজেলার ভাদিতলা দারুল আরকাম ইবতেদায়ী মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি বন্ধ। স্থানীয় বাসিন্দা এমদাদুল্লাহ, জসিম ও শাহজাহান জানান, শুরুর দিকে এক-দুই মাস চালুর পর দীর্ঘদিন ধরে এটি বন্ধ। অথচ শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন। অভিযোগের বিষয়ে ঈদগাঁও দারুল আরকামের শিক্ষক নুরুল আলম প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কথা স্বীকার করে জানান, তিনি বর্তমানে পাশের ইসলামাবাদের বোয়ালখালী এলাকায় এটি পরিচালনা করছেন এবং বকেয়া বেতন উত্তোলনের কথা নিশ্চিত করেন।
একই চিত্র পেকুয়া উপজেলায়। সেখানকার দারুল আরকাম ইবতেদায়ী মাদ্রাসার সভাপতি আখতারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “কাগজপত্রে স্বাক্ষর করে শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন তুলছেন, কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যক্রম নেই। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি তালাবন্ধ।” তিনি জানান, অনিয়মের বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন কক্সবাজার কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি।অন্যদিকে, টেকনাফের পল্লানপাড়া আজিজিয়া দাখিল মাদ্রাসার পরিচালক মোহাম্মদ আলী জানান, তাঁর এলাকায় চালুকৃত দারুল আরকামের শিক্ষকরা কোনো পাঠদান করেন না। অথচ গত মাসেই ভুয়া বিলে বকেয়াসহ প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। আবার অনেক শিক্ষক একই সময়ে একাধিক কওমী, নূরানী বা বেসরকারি মাদ্রাসায় চাকরি করে দ্বৈত বেতন ভোগ করছেন। পাহাড়তলী এলাকার একটি ভাড়া ভবনে চালুকৃত বেসরকারি মাদ্রাসায় দারুল আরকামের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে সরকারি টাকা তোলার খবর পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় শিক্ষক সমিতির এক নেতার স্ত্রীকে নিজ প্রতিষ্ঠানে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ দিয়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও বেতন দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।প্রকল্প নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলায় ২টি মাদ্রাসা এবং প্রতিটিতে ২ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী নেই; অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ভুয়া তালিকা তৈরি করে দেখানো হচ্ছে। বিনা বেতনে পড়ানোর নিয়ম থাকলেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক ফি আদায় করা হচ্ছে। পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ বিল ও অফিস স্টেশনারির নামে প্রতি অর্থবছর আসা সরকারি অনুদান ভুয়া বিল- ভাউচারে ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে।অভিযোগের বিষয়ে পাহাড়তলী এলাকার শিক্ষক ইউচুপ মক্কী দাবি করেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী রয়েছে এবং কার্যক্রম সঠিকভাবে চলছে।ইসলামিক ফাউন্ডেশন কক্সবাজারের উপপরিচালক মুহাম্মদ সরওয়ার আকবর জানান, দারুল আরকাম মাদ্রাসাগুলো বর্তমানে ভালোভাবেই চলছে। তবে বন্ধ প্রতিষ্ঠানে বকেয়া বেতন প্রদান, একই ব্যক্তির একাধিক জায়গায় চাকরি ও বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেননি।এদিকে স্থানীয়ভাবে প্রচার রয়েছে, অনিয়মের খবর ফাঁশ হওয়ার পর ইসলামিক ফাউন্ডেশন কক্সবাজার কার্যালয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের অজুহাতে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।সরকারি অর্থে পরিচালিত একটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রকল্পে এমন জালিয়াতি প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), কক্সবাজার জেলা প্রশাসন এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত দল গঠন করে জালিয়াতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।