নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা ও চট্টগ্রাম
নূরে আলম (শাহারিয়ার) “ বিশ্ব মিডিয়া “
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো একটি চক্রের তৎপরতা থামেনি। বিগত সরকারের আমলে প্রভাব খাটিয়ে, দুই সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টার নাম ভাঙিয়ে বিমানবন্দরের পাঁচটি লাভজনক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাগিয়ে নেওয়া এবং বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। পরিস্থিতি পরিবর্তনের পরও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একটি অসাধু চক্রকে ম্যানেজ করে আবারও সেসব প্রতিষ্ঠানের ইজারা বা লিজ নবায়নের জোর তৎপরতা চলছে বলে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।
গত বুধবার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যানের দপ্তরে এই অনৈতিক তৎপরতা বন্ধ এবং বিগত ১৫ বছরের জালিয়াতির তদন্ত চেয়ে একটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।
প্রভাবশালীদের ‘পরিচয়’ ও ইজারা সিন্ডিকেট।
অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিতর্কিত এই পাঁচ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের একক মালিক কিশোরগঞ্জ জেলার বাসিন্দা খান মোহাম্মদ ইকবাল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে পারিবারিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের দোহাই দিয়ে বেবিচকের সব নিয়ম-কানুন তোয়াক্কা না করে এই লিজগুলো হাসিল করেন তিনি।
অভিযোগে বলা হয়, খান মোহাম্মদ ইকবাল সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানকে নিজের ‘আপন ফুফা’ এবং অপর সাবেক রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট মোঃ আবদুল হামিদকে ‘উকিল শ্বশুর’ পরিচয় দিতেন। শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনার অত্যন্ত প্রভাবশালী সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের সরাসরি প্রভাবে বিমানবন্দরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন তিনি।
এতে অংশীদারিত্ব পার্টনার হিসেবে মো: জাহিদ আহসান রাসেল (জন্ম: ১ জানুয়ারী, ১৯৭৮) বাংলাদেশের গাজীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। তিনি ২০০৯, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত। এই প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ও বেবিচকের ভেতরের একটি শক্তিশালী চক্রকে ব্যবহার করে তিনি বছরের পর বছর কোনো প্রকার প্রতিযোগিতা ছাড়াই একচেটিয়া ব্যবসা পরিচালনা করেছেন।
যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক।
দুই বিমানবন্দরে খান মোহাম্মদ ইকবালের নিয়ন্ত্রণে থাকা ও বর্তমানে লিজ নবায়নের চেষ্টা করা পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো: ১. চিকেন এক্সপ্রেস (হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) ২. আইটি সেন্টার (হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) ৩. আলবি রেন্ট-এ-কার (হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) ৪. এয়ারপোর্ট হেল্প সার্ভিস (হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) ৫. এপিআই এভিয়েশন (শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম)
আয়কর ও ভ্যাট ফাঁকির মহোৎসব।
লিখিত অভিযোগে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যে, খান মোহাম্মদ ইকবাল নিজেকে এই একাধিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও পরিচালক হিসেবে পরিচয় দিলেও, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ভ্যাট বা ট্যাক্স প্রদানের বালাই ছিল না। প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো বৈধ ও নিয়মিত আয়কর (TIN) এবং ভ্যাট (BIN) নিবন্ধন নেই। বিগত সরকারের শীর্ষ মহলের অন্ধ সমর্থনের কারণে সরকারের কোনো সংস্থাই তার এই কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস পায়নি। বেবিচকের তৎকালীন অসাধু কর্মকর্তারাও এই বিশাল আর্থিক অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করে ছিলেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বেবিচকের চক্রটি সক্রিয়।
অভিযোগকারীরা উল্লেখ করেছেন, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বিমানবন্দরে এই ধরনের একচেটিয়া ও অবৈধ ইজারা বাতিল হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে বেবিচকের একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছে। এই চক্রটি মোটা অঙ্কের অনৈতিক আর্থিক সুবিধা (ঘুষ) নিয়ে খান মোহাম্মদ ইকবালের এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের লিজ নবায়ন বা পুনরায় তাদের অনুকূলে দেওয়ার জন্য পর্দার আড়াল থেকে ফাইল ও নথিপত্র তৈরি করছে।
সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থার দাবি।
বেবিচক চেয়ারম্যানের দপ্তরে জমা পড়া অভিযোগে অবিলম্বে এই লিজ প্রক্রিয়া স্থগিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে, বিগত বছরগুলোতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বেষ্টনী তথা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কীভাবে এই ধরণের ভ্যাট-ট্যাক্সবিহীন প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর দাপটের সাথে চলল এবং এর পেছনে বেবিচকের কোন কোন কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন, তা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে।
এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, লিখিত অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিমানবন্দরে যেকোনো ধরনের সিন্ডিকেট, অবৈধ লিজ এবং রাজস্ব ফাঁকির বিরুদ্ধে বর্তমান প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করবে এবং নিয়মের বাইরে কাউকে কোনো লিজ দেওয়া হবে না।