বিশেষ প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া | মো: সোহেলব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার ২১নং রতনপুর ইউনিয়নের শাহপুর ও রতনপুর মৌজায় চলছে এক ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়। সরকারের কঠোর নির্দেশনা ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও থামছে না অবৈধ ড্রেজার। দিনের আলোয় এবং রাতের অন্ধকারে অবাধে বালু উত্তোলনে একদিকে যেমন গিলে খাচ্ছে আবাদি জমি, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়েছে জনবসতি। স্থানীয় ভূমি অফিসের পরিদর্শন ও দায়সারা পদক্ষেপের পরেও কর্মকাণ্ডের কোনো হেরফের না হওয়ায় প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও কার্যকর ভূমিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।পরিদর্শনই সার: মাঠপর্যায়ে নেই কার্যকর ব্যবস্থানির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় ভূমি অফিসের প্রতিনিধি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু এলাকাবাসীর অভিযোগ, কর্মকর্তার এই পরিদর্শন ছিল কেবল ‘আইওয়াশ’। পরিদর্শন শেষে কর্মকর্তা ফিরে গেলেও ড্রেজারের গর্জন থামেনি, বরং এর তীব্রতা আরও বেড়েছে।এলাকাবাসীর প্রশ্ন, “যদি প্রশাসনের পরিদর্শনের পরও অবৈধ কাজ বন্ধ না হয়, তবে কার ইশারায় চলছে এই ধ্বংসযজ্ঞ? দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন এত নির্লিপ্ত কেন?”অভিযোগের কেন্দ্রে মো: রফিকুল ইসলামঅনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার করে এই অবৈধ ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করছেন মো: রফিকুল ইসলাম। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগায় এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মো: রফিকুল ইসলাম আইন অমান্য করে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন করে আসছেন। স্থানীয়দের দাবি, তার এই কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রভাবশালী মহলের মদদ রয়েছে। রফিকুল ইসলামের এই বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের ফলে শাহপুর ও রতনপুর এলাকার পরিবেশ আজ চরম বিপর্যয়ের মুখে।কৃষি ও পরিবেশের মহাবিপদনদী ও কৃষিজমি থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ইতিমধ্যে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিয়েছে। উর্বর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। কৃষকদের অভিযোগ, তাদের বাপ-দাদার ভিটেমাটি আর ফসলি জমি এখন অস্তিত্ব সংকটে। স্থানীয়রা ক্ষোভের সঙ্গে জানান, সরকার কৃষিজমি রক্ষার কথা বললেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন স্থানীয় পর্যায়ে নেই।প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ কি শুধুই কাগজে-কলমে?সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বারবার উচ্চারিত হলেও শাহপুর-রতনপুরের ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ যেন অদৃশ্য। স্থানীয়রা চারটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন:১. প্রশাসনের নজরে আসার পরও কেন অবৈধ ড্রেজার কার্যক্রম বন্ধ করতে অপারগ কর্তৃপক্ষ?২. অভিযোগের তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা কোথায়?৩. ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমি ও পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতির দায় কে নেবে?৪. মাঠপর্যায়ে সরকারের নীতি বাস্তবায়নে কি প্রশাসনিক সক্ষমতার অভাব, নাকি গাফিলতি?জরুরি দাবিশাহপুর ও রতনপুরবাসীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এখনই কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। তাদের প্রস্তাবিত দাবিগুলো হলো:অবিলম্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত: এলাকাটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করে অবিলম্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং মো: রফিকুল ইসলামের ড্রেজারসহ সমস্ত সরঞ্জাম জব্দ করা।নিরপেক্ষ তদন্ত: জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে বালু সিন্ডিকেটের নেপথ্যের হোতাদের চিহ্নিত করা।ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন: ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জমির ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া।জবাবদিহিতা: সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর বিভাগীয় শাস্তির ব্যবস্থা করা।প্রতিবেদকের মন্তব্য:এই অনুসন্ধান কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রোশ নয়; বরং প্রশাসনিক জবাবদিহি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কৃষিজমি রক্ষার স্বার্থে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট একটি বিষয় তুলে ধরার প্রয়াস। সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস, উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য গ্রহণের জন্য আমাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। অভিযুক্ত মো: রফিকুল ইসলামের বক্তব্য গ্রহণের প্রক্রিয়াও চলমান।এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন চলমান। পরবর্তী পর্বে প্রকাশ করা হবে—অভিযোগের নেপথ্যের তথ্য, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার প্রকৃত চিত্র এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য।জনস্বার্থে প্রকাশিত