বিশেষ প্রতিবেদক,বরগুনাবরগুনার তালতলী উপজেলা প্রকৌশলী মো. শাখাওয়াত হোসেনের একটি কথোপকথনের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। অডিওতে তিনি বদলির ক্ষেত্রে ‘জায়গামতো ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা দিতে হয়’ বলে মন্তব্য করেছেন বলে শোনা যায়। এ ছাড়া ঠিকাদারি কাজ বিক্রি, সাব ঠিকাদার নিয়োগ এবং সড়ক নির্মাণে অনিয়ম নিয়েও বিভিন্ন বক্তব্য উঠে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়েছে।জানা গেছে, বরগুনা তালতলী উপজেলার তুলাতলী-নিউপাড়া সড়ক নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয় সংবাদকর্মী সোহেল রানার সঙ্গে উপজেলা প্রকৌশলী মো. শাখাওয়াত হোসেন ও উপসহকারী প্রকৌশলী সামসুদ্দিনের দীর্ঘ কথোপকথন হয়। ওই কথোপকথনের ৬ মিনিট ৭ সেকেন্ডের একটি অডিও শনিবার (২৭ জুন) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।ভাইরাল অডিওতে উপজেলা প্রকৌশলীকে বলতে শোনা যায়, তুলাতলী-নিউপাড়া সড়ক প্রকল্পের মূল ঠিকাদার আঁখি কনস্ট্রাকশনের মো. বাদল হলেও তিনি কাজটি নয়ন মৃধার কাছে হস্তান্তর করেছেন। বর্তমানে নয়ন মৃধা সাব ঠিকাদার হিসেবে কাজটি পরিচালনা করছেন।এক পর্যায়ে উপসহকারী প্রকৌশলী সামসুদ্দিনকে বলতে শোনা যায়, “ওই রাস্তার ঠিকাদার নয়ন মৃধা। সে কে, তা চেনানোর দরকার নেই। সে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, খোঁজ নিলেই বুঝতে পারবেন।” জবাবে সংবাদকর্মী সোহেল রানা বলেন, “আমি তথ্য নিতে এসেছি। ঠিকাদার কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, সেটা দিয়ে আমার কী হবে।”সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে উপজেলা প্রকৌশলী বলেন, বৃষ্টির সময় মাটি ফেলার কারণে কিছু সমস্যা হয়েছে। শ্রমিকদের হাতে কাজ হওয়ায় কিছু ত্রুটি থাকতে পারে। তবে এ জন্য পুরো প্রকৌশল বিভাগকে দায়ী করা ঠিক হবে না।ঠিকাদারি ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা কাজ পাওয়ার পর ভ্যাট, আয়কর ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে লাভের জন্য কাজ অন্যের কাছে বিক্রি করে দেন। আবার সাব ঠিকাদাররাও লাভের হিসাব রেখে কাজ নেন। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়।জনবল সংকটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমার যদি পুলিশের মতো স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকত, তাহলে বিভিন্ন রাস্তায় লোক মোতায়েন করে রাখতে পারতাম। তাহলে রাস্তার অনিয়ম হতো না।অডিওর শেষ অংশে বদলি প্রসঙ্গে উপজেলা প্রকৌশলীকে বলতে শোনা যায়, আমরা আপনাদের উপজেলায় সারা জীবনের জন্য আসিনি। দুই-আড়াই বছর হয়ে গেছে। বাংলাদেশে ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে এটি জেড (জেড) ক্যাটাগরির উপজেলা। এখানে কেউ আসতে চায় না। মনপুরা ও রাঙ্গাবালীর চেয়ে একটু ভালো। কিন্তু আমি যদি জোর করে চলে যেতে চাই, তাহলে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা জায়গামতো দিয়ে যেতে হবে। এই টাকা দিয়ে কেন যাব বা বদলি হব?এ বক্তব্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, তুলাতলী-নিউপাড়া সড়কের নির্মাণকাজের শুরু থেকেই নানা অনিয়ম হয়ে আসছে। নিম্নমানের ইট ব্যবহার, কাঁদামাটি ও বালু মিশিয়ে কাজ করার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কের কিছু অংশ নরম ও স্যাঁতসেঁতে হয়ে যায়। বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে বিষয়টি গণমাধ্যমকর্মীদের অবহিত করা হয়।স্থানীয় সংবাদকর্মী সোহেল রানা বলেন, স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সড়কের কিছু অংশ কাঁদায় পরিণত হয়েছে। বিষয়টি ফেসবুক লাইভে তুলে ধরি। পরে তথ্য সংগ্রহের জন্য এলজিইডি কার্যালয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। সেই কথোপকথনের একটি অংশ রেকর্ড করে আমার ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেছি।তবে অডিও প্রকাশের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন উপজেলা প্রকৌশলী মো. শাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, সংবাদকর্মী তথ্য সংগ্রহের জন্য আমার কার্যালয়ে এসেছিলেন। তিনি আমার কক্ষে প্রবেশের আগেই মোবাইলে রেকর্ডিং চালু করেছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা শেষে তিনি প্রাক্কলনের কপি চেয়েছিলেন। আমরা জানিয়েছিলাম, সোমবার দেওয়া হবে। আমি খোলামেলা আলোচনা করেছিলাম। পরে তিনি সেই কথোপকথন রেকর্ড করে ফেসবুকে প্রকাশ করেছেন।