ওয়ালিউল্লাহ্ টিটু
এক হাতে স্মার্টফোন, চোখ আটকে স্ক্রিনে—এভাবেই বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের শৈশব। মাঠে খেলাধুলা, বই পড়া, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা পরিবারের সঙ্গে গল্প করার জায়গা দখল করে নিচ্ছে মোবাইল গেমিং ও অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার। প্রযুক্তি যখন মানুষের জীবনকে সহজ করার কথা, তখন তার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারই যেন ধীরে ধীরে গ্রাস করছে একটি পুরো প্রজন্মকে।সকাল ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথমেই মোবাইল, ঘুমানোর আগেও মোবাইল—অনেক শিশু-কিশোরের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা এখন এমনই। পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া, রাত জেগে থাকা, বাইরে খেলাধুলায় অনীহা, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার মতো নানা সমস্যায় ভুগছে তারা।সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ঢাকার স্কুলশিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৩ শতাংশের বেশি শিশু প্রতিদিন সুপারিশকৃত সময়ের চেয়ে বেশি সময় স্ক্রিনে কাটায়; গড়ে শিশুরা প্রায় ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসে ব্যয় করে। এর সঙ্গে ঘুমের সমস্যা, চোখের অস্বস্তি, মাথাব্যথা, স্থূলতা, মনোযোগের ঘাটতি ও মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকির সম্পর্কও উঠে এসেছে।শুধু স্ক্রিন নয়, অতিরিক্ত অনলাইন গেমিংও এখন বড় উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশের কিশোরদের ওপর পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সমস্যাজনক গেমিং আচরণের সঙ্গে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, একাকিত্ব, দুর্বল পারিবারিক তদারকি, অভিভাবকের সঙ্গে দূরত্ব এবং স্কুলে অনুপস্থিতির মতো বিষয়গুলোর সম্পর্ক রয়েছে।সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—অনেক অভিভাবক সন্তানের হাতে মোবাইল তুলে দিচ্ছেন ‘ব্যস্ত রাখার’ সহজ উপায় হিসেবে। কান্না থামাতে মোবাইল, খাওয়াতে মোবাইল, পড়তে বসাতে মোবাইল—একসময় সেই মোবাইলই হয়ে উঠছে শিশুর সবচেয়ে বড় নির্ভরতা। এরপর মোবাইল কেড়ে নেওয়া হলে দেখা দিচ্ছে রাগ, জেদ, অস্থিরতা ও আচরণগত পরিবর্তন।প্রশ্ন হলো—আমরা কি এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা বাস্তব জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে? যে প্রজন্ম মাঠের খেলাকে ভুলে যাবে, বইয়ের পাতায় মন বসবে না, পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে?প্রযুক্তি শত্রু নয়। মোবাইল ও গেমিংয়ের সঠিক ও সীমিত ব্যবহার শিক্ষামূলক ও বিনোদনমূলক কাজে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার যখন শিশুর ঘুম, পড়াশোনা, শারীরিক কার্যকলাপ, সামাজিক সম্পর্ক ও মানসিক সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তখন সেটি আর বিনোদন থাকে না—তা হয়ে ওঠে একটি সামাজিক সংকট।এই সংকট মোকাবিলায় শুধু সন্তানকে দোষারোপ করলেই হবে না। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে, শিশুদের বিকল্প বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ভূমিকা নিতে হবে এবং পরিবারে প্রযুক্তি ব্যবহারে সুস্থ সীমারেখা তৈরি করতে হবে।আজকের শিশু-কিশোররাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাদের হাত যদি বই, খেলাধুলা ও সৃজনশীলতার বদলে সারাক্ষণ মোবাইলের স্ক্রিনে বন্দি থাকে, তাহলে এর মূল্য দিতে হবে পুরো সমাজকেই।সময় থাকতে সতর্ক হওয়া জরুরি। কারণ আজ যে মোবাইলটি শিশুর হাতে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে তুলে দেওয়া হচ্ছে, নিয়ন্ত্রণহীন হলে কাল সেটিই হয়তো তার ভবিষ্যৎ কেড়ে নিতে পারে।