মো. সফর মিয়া, নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও কর্মকর্তার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। উপজেলার ২১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ২১৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১২৯টিতেই স্থায়ী কোনো প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকেরা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানে।অন্যদিকে, পুরো উপজেলার ২১টি ইউনিয়নের সব কটি প্রাথমিক বিদ্যালয় তদারকির জন্য ১১ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিইও) থাকার কথা থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র একজন। এতে উপজেলা শিক্ষা অফিসসহ পুরো এলাকার প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৭ হাজার ৪০০। বিপরীতে অনুমোদিত ১ হাজার ৪৪০ জন শিক্ষকের মধ্যে মাত্র ৯০টিতে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক রয়েছেন। বাকি ১২৯টি বিদ্যালয় চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে। প্রশাসনিক কাজ সামলাতে গিয়ে এসব শিক্ষক নিয়মিত ক্লাসে সময় দিতে পারছেন না। আবার অবসর, মৃত্যু, চাকরি পরিবর্তন বা প্রশিক্ষণের কারণে সহকারী শিক্ষকের পদও খালি রয়েছে অনেক স্কুলে।”ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অধিকাংশ সময় প্রশাসনিক কাজেই চলে যায়। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষক হিসেবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও নানা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে।”— রেজাউল করিম সবুজ, প্রধান শিক্ষক, আলীয়াবাদ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।উপজেলার কালিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্রও একই। প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মিন্টু মিয়া বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ে ৬ জন শিক্ষকের জায়গায় আছি মাত্র ৪ জন। তার ওপর আমাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। অফিসের কাজ সামলাতে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে ঠিকমতো সময় দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে।”শিক্ষার এই সংকট তৈরি হয়েছে শিক্ষা অফিসের চরম জনবল ঘাটতির কারণেও। কার্যালয়টিতে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পাশাপাশি ১১ জন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা থাকার কথা থাকলেও কাজ করছেন মাত্র ১ জন। অফিস সহায়কের ৫টি পদের বিপরীতে আছেন ১ জন, আর উচ্চমান হিসাব সহকারীর পদটি পুরোপুরি শূন্য। বাধ্য হয়ে মাঝেমধ্যেই বিদ্যালয় থেকে সহকারী শিক্ষকদের এনে অফিসের দৈনন্দিন কাজ করাতে হচ্ছে, যা স্কুলের পাঠদানে অতিরিক্ত জটলা তৈরি করছে।ভোলাচং উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আকতারুজ্জামান চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “১১ জনের কাজ একজনে করায় অফিশিয়াল কাজ নিয়ে দিনের পর দিন আমাদের অপেক্ষা করতে হয়।”এ বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মানিক ভূঁইয়া বলেন, “একাই ১১ জনের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে প্রতিদিন হিমশিম খেতে হচ্ছে। কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।”উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা উম্মে সালমা জানান, শিক্ষক ও তদারকি কর্মকর্তার শূন্য পদের হালনাগাদ তথ্য প্রতি মাসেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হচ্ছে। দ্রুত নতুন নিয়োগ না দিলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।সমস্যার বিষয়টি স্বীকার করে স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান বলেন, “নবীনগরের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক সংকট, জনবল ঘাটতি এবং জরাজীর্ণ ভবনের বিষয়টি ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছি। অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা দূর করতে ও শিক্ষার মান বজায় রাখতে দ্রুত শূন্য পদগুলোতে নিয়োগের জন্য আমি জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।