শেফাইল উদ্দিন, কক্সবাজার
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ বন্ধ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখা।রবিবার (২৩ আগস্ট) কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে বাপা নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অবৈধ দখল, স্থাপনা নির্মাণ ও বালিয়াড়ি ধ্বংসের কারণে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে সুগন্ধা বিচ পয়েন্টের বালিয়াড়ির ওপর সড়ক নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।বাপার দাবি, সমুদ্রের বালিয়াড়ি শুধু সৈকতের সৌন্দর্যের অংশ নয়; এটি ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও শক্তিশালী ঢেউয়ের বিরুদ্ধে উপকূলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। একই সঙ্গে বালিয়াড়ি সামুদ্রিক কচ্ছপসহ বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। ফলে বালিয়াড়ি কেটে সড়ক বা স্থাপনা নির্মাণ করা হলে উপকূলীয় ভাঙন, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং পর্যটন পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র ও নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশ জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলীয় ক্ষয় মোকাবিলায় প্রাকৃতিকভাবে বালিয়াড়ি সৃষ্টি ও সংরক্ষণে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। কক্সবাজার সৈকতের ভাঙন রোধ এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায়ও ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বালুর ডেইল বা বালিয়াড়ি সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।বাপার অভিযোগ, একদিকে সৈকত রক্ষায় বালিয়াড়ি সৃষ্টি ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে পাশেই বিকল্প জায়গা থাকা সত্ত্বেও সড়ক নির্মাণের নামে সেই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা হচ্ছে।হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নের দাবিস্মারকলিপিতে মহামান্য হাইকোর্টে দায়ের করা জনস্বার্থমূলক মামলা নং ২২৬/২০১১-এর রায় ও নির্দেশনার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। বাপার ভাষ্য, ওই রায় ও নির্দেশনার আলোকে সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়ি দখলমুক্ত ও সংরক্ষণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে।এছাড়া ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ-২ শাখা থেকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক বরাবর দেওয়া চিঠিতে বালিয়াড়িতে থাকা অবৈধ দোকান, ভাসমান স্থাপনা ও বিভিন্ন অস্থায়ী লাইসেন্স বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলেও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।বাপার দাবি, এসব নির্দেশনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পরিবর্তে নতুন করে বালিয়াড়ির ওপর সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা আদালতের নির্দেশনা, পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।বাপার ছয় দফা দাবিস্মারকলিপিতে সুগন্ধা বিচসহ সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে চলমান সড়ক নির্মাণ অবিলম্বে বন্ধ এবং হাইকোর্টের মামলা নং ২২৬/২০১১-এর রায় ও নির্দেশনা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।এছাড়া ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ স্থাপনা ও দখল উচ্ছেদ, বালিয়াড়িতে কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) ও বিশেষজ্ঞ মতামত বাধ্যতামূলক করা, বালিয়াড়ি ও সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজননক্ষেত্রসহ উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ এবং পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।বাপা কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি এম জাফর আলম দিদার ও সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিতে বলা হয়, কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ।তারা বলেন, সাময়িক উন্নয়নের নামে সৈকতের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা হলে এর ক্ষতি অপূরণীয় হতে পারে। বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়ি রক্ষায় সড়ক নির্মাণ বন্ধ এবং পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ ও প্রয়োজনীয় কঠোর নির্দেশনা জরুরি।