শেফাইল উদ্দিন, কক্সবাজার
পর্যটনের রাজধানী হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার এখন উদ্বেগজনক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে নতুন করে আলোচনায়। হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক। এমনকি আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে গোলাগুলি এবং একজন বিচারককে অস্ত্র প্রদর্শন করে ভয় দেখানোর মতো ঘটনাও জেলার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।জেলা পুলিশের নিজস্ব পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মাত্র সাত মাসে কক্সবাজারে ৮৮টি হত্যাকাণ্ড ও ১২৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ২৯৭টি। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে হয়েছে দেড় শতাধিক মামলা।তবে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ—প্রকাশ্যে ঘটতে থাকা সব অপরাধের প্রকৃত চিত্র সরকারি হিসাবেও উঠে আসছে না। বিশেষ করে পর্যটন এলাকাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে চুরি, ছিনতাই ও অপহরণের অনেক ঘটনায় মামলা কিংবা সাধারণ ডায়েরি না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।অপরাধ বৃদ্ধির পাশাপাশি জেলা পুলিশের নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পুলিশিং নিয়ে বিভিন্ন মহলে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমানের বিরুদ্ধে হঠকারী সিদ্ধান্ত, দুর্বল পুলিশিং এবং বিভিন্ন ঘটনায় বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ তুলেছেন আইনজীবী, সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য ও পুলিশের একাংশ।স্থানীয়দের অভিযোগ, কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ৩০টি পর্যন্ত চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্রিক এলাকায় পর্যটক ও সাধারণ মানুষ অপরাধীদের শিকার হচ্ছেন।কিন্তু এসব ঘটনার বড় অংশ থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত না হওয়ায় অপরাধের প্রকৃত চিত্র আড়ালেই থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।বিচারক জানান, গত বছরের ৩০ নভেম্বর আদালত প্রাঙ্গণে এক যুবক পিস্তল প্রদর্শন করে একজন বিচারককে ভয় দেখানোর অভিযোগ ওঠে। পরে আরও দুই বিচারক তৎকালীন সদর থানার ওসিকে ডেকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন।বিষয়টি পুলিশ সুপারকেও জানানো হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, পরে এ ঘটনায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।এরপর জানুয়ারিতে নিরাপত্তার স্বার্থে জেলা জজ পদমর্যাদার একাধিক বিচারক পুলিশ সুপার বরাবর গানম্যান চেয়ে চিঠি দেন। অভিযোগ রয়েছে, তাদের গানম্যান দেওয়া হয়নি এবং চিঠিরও কোনো জবাব মেলেনি।পরবর্তীতে গত ২৪ মে দিনের আলোয় আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনায় দুইজন গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হন।কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবদুল মন্নান বলেন, স্বাধীনতার পর কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এতটা নাজুক অবস্থায় তিনি আগে দেখেননি।তার মতে, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যা নামার আগেই সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। আদালত এলাকায় গোলাগুলি এবং বিচারকদের অস্ত্র প্রদর্শন করে ভয় দেখানোর অভিযোগে বিচারক, আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।গত ২৪ মার্চ রাতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ছুরিকাঘাতে নিহত হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক খোরশেদ আলম।ঘটনার পর তারিন নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে, তার কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ছুরিও উদ্ধার করা হয়েছিল।কিন্তু খোরশেদের জানাজা চলাকালে সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ সুপার তারিনকে নির্দোষ বলে উল্লেখ করেন—এমন অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।নিহতের পরিবারের অভিযোগ, এর আগে খোরশেদকে হুমকি দিয়েছিলেন ওই ব্যক্তি।একই সময়ে খোরশেদের কাকা তারেককে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। পরে একটি সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ্যে আসার পর ঘটনার সময় তারেকের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং পুলিশের বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।পরিবারের অভিযোগ, প্রধান সন্দেহভাজনকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়। পরে পুলিশের তদন্তের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করে মামলার বাদী নাওশাদ হোসেন আদালতের মাধ্যমে মামলাটি পিবিআইতে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেন।বর্তমানে ওই ব্যক্তি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।গত ২২ এপ্রিল খুরুশকুল এলাকায় মন্দিরের সেবায়েত নয়ন সাধুকে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।এ হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন তথ্য নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন সাংবাদিক অন্তর দে বিশাল। তার অভিযোগ, সংবাদ প্রকাশের পর তা সরিয়ে না ফেললে তাকে হত্যা মামলায় জড়ানোর হুমকি দেওয়া হয়।অভিযোগে বলা হয়, এসপির আস্থাভাজন একটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য সোহেল তাকে এ হুমকি দেন। যদিও সোহেল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।সাংবাদিক অন্তর দে দাবি করেন, বিষয়টি পুলিশ সুপারকে জানালে তিনি তাকে প্রশ্ন করেন—“আপনাকে নিউজ করতে কে বলছে?”তার আরও দাবি, সাধারণ ডায়েরি করার বিষয়েও তাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। পরে সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে সদর থানা জিডি গ্রহণ করে।এ ঘটনায় সাংবাদিকরা মানববন্ধন করেন। পূজা উদ্যাপন কমিটির পক্ষ থেকেও হুমকির প্রতিবাদ জানিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।পরে কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ-সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলের হস্তক্ষেপে আন্দোলন বন্ধ হলেও অভিযোগকারীদের মতে, ঘটনার কার্যকর সমাধান হয়নি।রামু থানা পুলিশের বিরুদ্ধে বড় একটি ইয়াবার চালান আত্মসাতের অভিযোগের তথ্যপ্রমাণ নিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে একটি জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক শাহেদ ফেরদৌস হিরুকে পুলিশ সুপার প্রশ্ন করেন—“ইয়াবা নিয়ে সাংবাদিকদের এত আগ্রহ কেন?সাংবাদিক হিরুর অভিযোগ, পুলিশের নেতৃত্বে দুর্বলতা, অদক্ষতা ও পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণে কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির কয়েকজন সদস্যের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কেউ সমালোচনামূলক বক্তব্য দিতে শুরু করলে অনেক সময় পুলিশ সুপার তাকে থামিয়ে নিজেই বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন।তাদের মতে, এতে সভায় খোলামেলা আলোচনা ও মতামত দেওয়ার পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হয়।অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় সংসদ-সদস্যসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও কখনো কখনো তিনি মোবাইল ফোনে উচ্চস্বরে কথা বলেন। এতে উপস্থিত অনেকের মধ্যে বিরক্তি সৃষ্টি হয়।সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত একটি বৈঠকে এসপির আচরণ নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ-সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ।পুলিশের অন্দরেও অসন্তোষজেলা পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুলিশের একটি অংশও বর্তমান পুলিশিং নিয়ে অসন্তুষ্ট।তাদের অভিযোগ, হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার কারণে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে।গোপন তথ্য ফাঁসের অভিযোগে সম্প্রতি ১০১ জন পুলিশ সদস্যকে বদলি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ৭ জন পরিদর্শক, ৩৬ জন এসআই, ২৪ জন এএসআই এবং ৩৪ জন কনস্টেবল।পুলিশের একাধিক সদস্যের অভিযোগ, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সরিয়ে অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞদের দায়িত্ব দেওয়ার কারণে বিভিন্ন ইউনিটের কার্যক্রমে প্রভাব পড়ছে।আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, দেশে প্রতি মাসে প্রায় ৩০০টির মতো হত্যাকাণ্ড ঘটে এবং কক্সবাজারে প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০টি হত্যার ঘটনা ঘটে।তিনি বলেন, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড প্রতিক্রিয়াজনিত ও পারিবারিক কারণে হয়ে থাকে এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে।অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে কিছুটা বিরক্তির সঙ্গে তিনি বলেন, “আমি তো অথর্ব এসপি। আপনাদের প্রিয় এসপি যখন ছিল, তখনও মার্ডার এমন হতো।”এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।অপরাধের পরিসংখ্যান একদিকে, আর পুলিশের নেতৃত্ব নিয়ে অভিযোগ অন্যদিকে—দুই বাস্তবতার মাঝে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কক্সবাজারবাসীর নিরাপত্তা ফিরবে কবে?