ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি ঃ
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি আওলাদ হোসেন প্রায় ১১ বছর ধরে মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে ওই প্রতিষ্ঠানকে ঠুটো জগন্নাতে পরিণত করেছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ বাণিজ্য,টেন্ডার বাণিজ্য,পদোন্নতি, দুর্নীতি-অনিয়ম করে গড়ে তুলেছিলেন বিশাল সা¤্রাজ্য। সেই সা¤্রাজ্যেরই প্রধান সেনাপতি ছিলেন তারই ড্রাইভার সিরাজ। গভর্নিং বডির সভাপতি আওলাদেরই বদান্যতায় কোটিপতি হয়েছেন ড্রাইভার সিরাজ।
মতিঝিল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ সূত্রে জানা যায়, মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার পূর্ব মির্জাপুরের হতদরিত্র ঘরের সন্তান মো: সিরাজুল ইসলাম সিরাজ বিগত ৩ মার্চ ২০১৩ সালে ড্রাইভার পদে চাকরি নেন। এর আগে সিরাজ শিবচর উপজেলা আওয়ামী লীগের অংগসংগঠন রিক্সা-ভ্যান শ্রমিক লীগের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী পরিবারের লোক হওয়ায় আওলাদের সান্নিধ্যে আসতে বেশি সময় লাগেনি তার। গাড়ি চালানো থেকে শুরু করে ফুট ফরমাইজ সবই শুনেছেন তিনি। এতে করে আওলাদের আরও ঘনিষ্ঠ হন সিরাজ ড্রাইভার। এরপর আর তাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে নিয়োগ বাণিজ্য, পদোন্নতি, অনিয়ম-দুর্নীত আর যে ভয়ের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন আওলাদ, সেখান থেকেই বহু ফায়দা লুটেছেন তারই ড্রাইভার সিরাজ।
তৃতীয় শ্রেণির এই কর্মচারি আওলাদের গাড়ি চালানোর পাশাপাশি গভীর রাতে ট্রাকে করে রড চুরি, গাড়ীর তেল চুরি, পানির ট্যাংকি চুরিসহ বহু অপকর্ম করতেন। তিনি গাড়ির চালক হিসেবে নিয়োগ পেলেও আওলাদের আশীর্বাদে এবং নিজের কূট কৌশলে রাতারাতি হয়ে যান স্কুলের স্বঘোষিত আওলাদের প্রধান সেনাপতি। আওলাদের নির্দেশনায় করেন নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, ঘুষ বাণিজ্য, গাড়ি মেরামতের কথা বলে কাজ না করিয়ে ভুয়া বিল ভাউচার, ক্যান্টিন বাণিজ্য। এসব অনিয়ম আর দুর্নীতি করে হয়ে যান কোটি কোটি টাকার মালিক।ড্রাইভার সিরাজকে কেন্দ্র করে মতিঝিল মডেল স্কুল এন্ড কলেজে গড়ে উঠেছে এক অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প, যা এখন স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী আমলে দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো মতিঝিল মডেল স্কুল এন্ড কলেজেও বিভিন্নভাবে ভুয়া এবং লোক দেখানো রেজুলেশনের মাধ্যমে বহু নিয়োগ বাণিজ্য করা হয়েছে।
বিগত ২০ ডিসেম্বর-২০১৮ ইং তারিখের একটি পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। সেই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বয়স উল্লেখ করা ছিল সর্বোচ্চ ৩৫ বছর। নিয়োগ বিধি অনুযায়ী তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সেলিনা শামসী বিভিন্ন (পিয়ন, পরিচ্ছন্ন কর্মি, আয়া, গার্ড, নৈশ প্রহরী) ক্যাটাগরিতে ২০১৯ সালে ৪২ জন কর্মচারি নিয়োগ প্রদান করা হয়। প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৩৫ বছরের কথা উল্লেখ করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি বয়সের কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছে। কর্মচারিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বয়সের কর্মচারিদের কিছু তালিকা তুলে ধরা হলো এর মধ্যে (১) লাল মিয়া, স্মার্ট কার্ডের তথ্য মোতাবেক তার জন্ম তারিখ- ০২ এপ্রিল-১৯৭৩ ইং। একই জাতীয় পরিচয়পত্র নং দিয়ে সঠিক স্মার্ট কার্ড নং-৭৭৬১৩২৩৫০৫ বাদ দিয়ে সঠিক এনআইডির পিন নম্বর দিয়ে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে জন্ম তারিখ দেয়া হয় ০১ জানুয়ারি ১৯৮৪ ইং, বয়স কমিয়ে চাকরিতে যোগদান করেন। মূলত প্রকৃত পক্ষে তার সঠিক বয়স ২০১৯ সালে ৪৬ বছর। (২) ফাতেমা আক্তার রানু, জন্ম তারিখ ১৫ নভেম্বর-১৯৮১ ইং। চাকরিতে যোগদানের সময় তার বয়স হয় ৩৭ বছর ৭ মাস ১৬ দিন, (৩) মনির হোসেন সুমন জন্ম তারিখ ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮১ ইং। ২০১৮ সালের নিয়োগে তার বয়স পরিলক্ষিত হয় ৩৭ বছর ১১ মাস। (৪) শিউলি বেগম, জন্ম তারিখ ১৮ জানুয়ারি-১৯৮২, চাকরিতে প্রবেশের সময় তার বয়স হয় ৩৬ বছর ১১ মাস ১৩ দিন। (৫) আব্দুল মান্নান ৩ মার্চ ১৯৮৩ ইং। চাকরিতে প্রবেশের সময় তার বয়স হয় ৩৫ বছর ১০ মাস।
আওয়ামী লীগের দোসর আওলাদ হোসেন গভর্নিং বডির সভাপতি থাকাকালীন ক্ষমতার অপব্যবহার করে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সেলিনা শামসীকে চাপ দিয়ে বিপুল টাকার বিনিময়ে শুধু নিয়োগ নয় বহু অপকর্ম করিয়েছেন। ওই সময় আওলাদ রাতকে দিন বললে দিন আর রাতকে দিন বললে দিন হতো। সে সময় মডেল স্কুলে একটা কথা প্রচলিত ছিলÑআকাম করেছেন আওলাদ, স্বাক্ষর দিয়েছেন শামসী। সেই আকামের দায় ড্রাইভার সিরাজেরও কম ছিল না। ওই সময় যত কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছে তার বেশিরভাগই সিরাজের কালেকশন এবং আওয়ামী ঘরানার। তিনি যে লোকগুলো দিতেন, তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ৭Ñ৮ লক্ষ টাকা আদায় করে ৩ লক্ষ টাকা আওলাদকে দিকে বাকি টাকা নিজের পকেটে ভরেন। এছাড়াও সিরাজ দিনে করেছেন ড্রাইভারী রাতে করেছেন চুরি-চামারী।
শুধু তাই নয়, মতিঝিল মডেল স্কুল এন্ড কলেজের বিভিন্ন শাখায় পিয়ন-আয়া-সুইপার নাইটগার্ডসহ অনেককে ভুয়া আইডি কার্ড তৈরি করে চাকরিতে নিয়োগ দানে সহায়তা করেছেন। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাটির ১টি নোহা মাইক্রোবাসের জন্য ৩জন ড্রাইভার নিয়োগ করা হয়েছে, তাও সিরাজের আমদানিকৃত। অবাক করার বিষয় হচ্ছেÑসিরাজই সমস্ত কর্মচারীর হর্তাকর্তা। তার ওপর খবর দারি করার সাহস আগেও কারো ছিল না, সবাই তাকে সমীহ করে চলতো। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সিরাজ তার আপন ছোট ভাই মোঃ ফয়সালকে ড্রাইভার হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেছেন।
এখানে শেষ নয়, বিগত দিনে স্কুলে বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের কাজ শেষে যত পুরাতন মালামাল ছিল এর মধ্যে পুরাতন মোটা রড আনুমানিক প্রায় দেড় থেকে দুই টন, প্লেন সিটসহ যাবতীয় মালামাল রাতের আধারে পুরাতন কলেজ ভবনের গেট দিয়ে ট্রাকে ভরে নিয়ে যায়। এছাড়াও যত উন্নয়মূলক কাজ হতো সবই ড্রাইভার সিরাজের হস্তক্ষেপে পরিচালিত হতো। গাড়িচালক পেশার আড়ালে হেনো কোনো অবৈধ কর্মকা- নেই যা তিনি করেননি। স্কুলের সব নিয়ন্ত্রণ রেখেছিলেন নিজের কব্জায়। নিয়োগ-বাণিজ্য থেকে শুরু করে ক্রয়, টেন্ডারবাজি ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। স্কুলের শিক্ষক-আয়া, সুইপার, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদেরও নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। তার নিজ এলাকায় ও স্কুলে ছিলেন মূর্তিমান এক আতঙ্ক। যার বদৌলতে অবৈধভাবে দু’হাতে কামিয়েছেন টাকা। সেই টাকা দিয়ে ঢাকার দক্ষিণ মানিকনগরে করেছেন বাড়ি হোল্ডিং নং টি-৫৯৬০০, মাদারীপুর জেলা শহরে গড়েছেন বিলাস বহুল বাড়ি, শিবচরে কিনেছেন বিঘায় বিঘায় ফসলি জমি। ব্যাংকে জমিয়েছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। তার স্ত্রীর নামেও রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার এফডিআরসহ স্বর্ণালংকার।
সূত্রে আরো জানা যায়, ড্রাইভার সিরাজ সাবেক গভর্নিং বডির সভাপতি আওলাদের নাম ভাঙ্গিয়ে ভালো শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যে ভয়-ভীতি দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে কমিশন আদায় করতো। অষ্টম শ্রেণিতে পড়–য়া হলেও ড্রাইভার সিরাজ বাস্তবে এক ভয়ঙ্কর ব্যক্তি। স্কুলের কর্মচারী থেকে শুরু করে শিক্ষকদের সাথেও খারাপ আচরণ করতেন। তখন তার ভয়ে সবাই তটস্থ থাকতো। কেউ মুখ খুললে আওলাদকে দিয়ে তাকে নানাভাবে হয়রানি করতো ড্রাইভার সিরাজ। সেই ড্রাইভার আজও বহাল তবিয়তে থেকে চাকরি করে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, কোন কারিশমায় আজ আওলাদের ঘেটুস মডেলে কর্মরত ?
—বিস্তারিত আগামী সংখ্যায় আসছে—–