উপকূলীয় জেলা বরগুনায় কৃষিজমিতে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার, জলাশয় ভরাট-দখল এবং প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ শিকারের কারণে দেশীয় মাছের অস্তিত্ব চরম হুমকিতে পড়েছে। একসময় নদী-খাল-বিলভরা টাকি, মাগুর, শোল, গজার, টেংরা, বোয়াল, রুই-কাতলা—এখন প্রায় অদৃশ্য। দ্রুত ভেঙে পড়ছে প্রাকৃতিক মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির চক্র।
Advertisement
বরগুনা জেলা মৎস্য দপ্তরের সর্বশেষ জরিপ অনুসারে, গত ২০ বছরে দেশীয় কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ প্রজাতির মাছের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ২০০৫ সালে মৌসুমি জাল ফেলে ৪৫–৫০ কেজি মাছ পাওয়া গেলেও ২০১৫ সালে তা নেমে আসে ২০ কেজির নিচে। ২০২৪ সালে একই জালে মিলছে মাত্র ৫–৭ কেজি মাছ। শোল, টাকি, আইড়, বেলে, ধাইরা প্রজাতি ৮০ শতাংশের বেশি হারিয়ে গেছে। জলাশয়ের কম অক্সিজেন, বিষাক্ত রাসায়নিক ও আবাসস্থল ধ্বংসকে এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ বলা হচ্ছে।
কৃষকরা বেশি ফলনের আশায় উচ্চমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করছেন। বর্ষায় এসব রাসায়নিক ধুয়ে পাশের খাল-বিল ও নদীতে প্রবেশ করে দুষণ বাড়াচ্ছে। এতে মাছের শ্বাস-প্রশ্বাস, খাদ্য গ্রহণ, ডিম ছাড়ার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক পুকুরেও মাছ মরার ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে নদী-খাল ভরাট হওয়ায় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হয়ে গেছে। তার ওপর চাঁইসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর ফাঁদে ছোট লাইন্সহ সব বয়সী মাছ ধরা পড়ায় স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি বিঘ্নিত হচ্ছে।
এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাজারে। এক দশক আগেও যে দেশীয় মাছ কেজিপ্রতি ১৮০–৩০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তার দাম তিন–চার গুণ বেশি। বরগুনার বাজারে ছোট টাকি ৫০০–৬০০, মাগুর ৭০০–৮০০, শোল ৯০০–১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশীয় মাছের ঘাটতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের পাতে এখন মাছ উঠে ‘বিলাসিতা’।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারগুলো। আগে প্রতিদিন ১৫–২০ কেজি মাছ ধরতে পারলেও এখন ৩–৪ কেজিও পাওয়া কঠিন। অনেকেই পেশা বদলে দিনমজুরি কিংবা ভ্যান চালানোর মতো কাজে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাসায়নিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জলাশয় রক্ষা, প্রজনন মৌসুমে কঠোর অভিযান, অবৈধ জাল বন্ধ এবং অভয়াশ্রম সম্প্রসারণ ছাড়া এখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে বরগুনায় দেশীয় মাছের অস্তিত্ব শুধু ইতিহাসের পাতাতেই রয়ে যাবে।