[নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা]** “বিশ্ব মিডিয়া”
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা ও সরকারি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ভুয়া সনদ তৈরির দায়ে দুটি কম্পিউটার দোকানকে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। বুধবার (২২ এপ্রিল) কসবা পৌর সুপার মার্কেটে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।অভিযানের বিস্তারিতগোপন সংবাদের ভিত্তিতে কসবা পৌর সুপার মার্কেটে অভিযান চালায় উপজেলা প্রশাসন। অভিযানে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় দুটি দোকানকে মোট ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. তানজিল কবির।উদ্ধারকৃত নথিপত্রঅভিযান চলাকালীন দোকানগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ ভুয়া নথিপত্র ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে:পৌর প্রশাসক ও বিভিন্ন ইউপি চেয়ারম্যানদের স্বাক্ষর সংবলিত জাল ওয়ারিশ সনদ।স্মারক নম্বর ও তারিখ জালিয়াতি করা বিভিন্ন চারিত্রিক সনদ।বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ভুয়া প্রত্যয়নপত্র ও লোগো সংবলিত ব্লাঙ্ক প্যাড।”এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষকে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে প্রতারিত করে আসছিল। জনস্বার্থে এবং জালিয়াতি রোধে প্রশাসনের এই ধরনের কঠোর অবস্থান ও অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।”— মো. তানজিল কবির, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।জনস্বার্থে সতর্কতাপ্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে কোনো দাপ্তরিক কাজের জন্য সরাসরি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা কার্যালয়ে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অবৈধভাবে তৈরিকৃত এসব সনদ ব্যবহার করাও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।বিগত সময়ে এই দোকানের মালিকের সম্পর্কে এবং এই দোকানের সম্পর্কে একাধিকবার রিপোর্ট প্রকাশিত হয় গণমাধ্যমে। কিন্তু তার সুনির্দিষ্ট কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি এখন পর্যন্ত।ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাম্প্রতিক অভিযানের পর বেরিয়ে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।জাল সনদ তৈরি করে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার এই চক্রটির একটি বিশেষ সম্পর্কের কথা জানা গেছে।

এটি শুধুমাত্র কয়েকজন দোকানদারের কাজ নয়, বরং এর পেছনে দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক এবং সুপরিকল্পিত জাল ছড়ানো রয়েছে।### **১. সম্পর্কের জাল: কিভাবে কাজ করে এই সিন্ডিকেট?**এই অবৈধ কারবারটি মূলত তিনটি প্রধান স্তরে বিভক্ত হয়ে কাজ করে। এই স্তরগুলোর মধ্যে সম্পর্ক এতটাই গভীর যে, এক অংশের সহযোগিতা ছাড়া অন্য অংশের টিকে থাকা অসম্ভব।**ক) নেপথ্যের কারিগর (The Insiders): নির্বাচন কমিশনের কর্মচারী**চক্রটির সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী অংশ হলেন উপজেলা নির্বাচন অফিসের কয়েকজন কর্মচারী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হলো উপজেলা নির্বাচন অফিসে কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর **মো: মাজিদ হোসেন** এবং **মো: ইসমাইল হোসেন**। ২০ মার্চ ২০২৫ তারিখে দৈনিক স্বাধীনত নামের পত্রিকায় একটি নিউজ এর পরিপ্রেক্ষিতে এবং একজন প্রতিবাদী ব্যক্তি হিসেবে অভিযোগ করাই এই দুজনের বদলি আদেশ জারি হয়েছিল , কিন্তু আফসার আহমেদ (আকিব) নামে কম্পিউটার অপারেটর উপজেলা নির্বাচন অফিস বহাল রয়ে যায়। তাদের সম্পর্কের সুবাদে তারা সহজেই এনআইডি (NID) সার্ভার এবং অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্যে প্রবেশ করতে পারেন। তথ্য জালিয়াতি, জন্ম নিবন্ধন বা অন্যান্য দাপ্তরিক কাগজপত্রের খুঁটিনাটি ভুল সংশোধন এবং বিশেষ করে জাল সনদগুলোতে ‘স্মারক নম্বর’ এবং ‘তারিখ’ এমনভাবে বসানো, যাতে সেগুলো প্রথম দেখায় কোনোভাবেই ভুয়া বলে সন্দেহ না হয়—এই কাজগুলো তারাই পর্দার আড়ালে থেকে সম্পাদন করেন।**খ) যোগসূত্র (The Connectors): বহিরাগত দালাল চক্র**নির্বাচন অফিসের কর্মচারীদের সাথে সরাসরি সাধারণ মানুষের যোগাযোগ খুব কম হয়। এই গ্যাপ পূরণ করে বহিরাগত দালাল চক্র। তাদের প্রধান কাজ হলো নির্বাচন অফিসের আশপাশে ঘোরাঘুরি করা এবং এনআইডি কার্ড বা অন্যান্য সনদের ভুল সংশোধন, বা নতুন সনদ তৈরির জন্য আসা মানুষদের ফুসলিয়ে নিজেদের হাতে নেওয়া। তারা ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে উচ্চ হারে টাকা আদায় করে এবং সেই টাকার একটি অংশ নির্বাচন অফিসের কর্মচারীদের (আফসার আহমেদ (আকিব) সহ জেলা অফিস হতে আঞ্চলিক পর্যন্ত) কাছে তার নির্দিষ্ট ভাগ পৌঁছে দেয়। একটি সূত্রের দ্বারা চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। এই দালালরা মূলত বিশ্বস্ততার সেতু হিসেবে কাজ করে। তাদের সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক লাভ এবং গোপনীয়তা বজায় রাখা।**১) ফ্রন্টম্যান (The Frontmen): কম্পিউটার দোকানদার ও মালিক**কসবায় পৌর সুপার মার্কেটের দুটি কম্পিউটার দোকান এই চক্রের ‘ফ্রন্ট’ হিসেবে কাজ করে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে আটক দোকানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো **‘সাইফুল ইসলাম ব্রাদার্স কম্পিউটার অনলাইন’**। এর মালিক সাইফুল ইসলাম নিজেকে এই সিন্ডিকেটের অন্যতম মূল হোতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার দোকানেই চলে জালিয়াতির সব কারিগরি। দালালরা ক্লায়েন্টদের নিয়ে আসে, দালালদের দেওয়া তথ্য বা নির্বাচন অফিস থেকে পাওয়া অ্যাক্সেস ব্যবহার করে এই দোকানদাররা ডিজিটাল সফটওয়্যারে দক্ষ ব্যবহার করে খুব সহজেই পৌর প্রশাসক, ইউপি চেয়ারম্যান, এমনকি ম্যাজিস্ট্রেটদের স্বাক্ষর স্ক্যান করে ভুয়া সনদগুলোতে বসিয়ে দেয়। সাইফুল ইসলামের সাথে দালালদের এবং নির্বাচন অফিসের কর্মচারীদের সম্পর্ক এতটাই গভীর যে, তাদের একে অপরের অবৈধ চাহিদা মিটিয়ে দীর্ঘদিনের একটি স্থায়ী আস্তানা গড়ে তুলেছে।### **২. সম্পর্কের গভীরতা এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা**এই তিনটি পক্ষের সম্পর্ক শুধুমাত্র টাকার বিনিময়ে লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি গভীর পারস্পরিক নির্ভরশীলতার উপর প্রতিষ্ঠিত। * **আফসার আহমেদ (আকিব) বনাম দালাল:** দালালরা না থাকলে মাজিদ বা ইসমাইল সরাসরি সাধারণ মানুষের থেকে টাকা নিতে পারতেন না, কারণ এতে ধরা পড়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে, দালালরা তাদের ‘কাজ’ (ভুয়া তথ্য এনরোল করা বা দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়া) মাজিদদের সাহায্য ছাড়া সম্পন্ন করতে পারে না। * **বিগত সময়ের চাকরির অবস্থান কালীন (মাজিদ-ইসমাইল) বনাম সাইফুল:** সাইফুল ইসলামের কম্পিউটার দোকানে এমন সব উন্নতমানের প্রিন্টার এবং স্ক্যানার রয়েছে যা দিয়ে একদম নিখুঁতভাবে সরকারি স্বাক্ষর ও সিল স্ক্যান করা সম্ভব। নির্বাচন অফিসের কর্মচারীরা এই প্রযুক্তির সুফল ভোগ করে, কারণ তাদের কাছে অফিসের বাইরে এই কাজ করা ঝুঁকি। আবার, সাইফুল ইসলামের দোকানের ‘ব্যবসা’ নির্বাচন অফিস থেকে ‘সাপ্লাই’ দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। * **দালাল বনাম সাইফুল:** সাইফুল ইসলামের দোকানটি দালালদের জন্য একটি নিরাপদ ‘ওয়ার্কশপ’ যেখানে তারা ক্লায়েন্টদের নিয়ে এসে দ্রুত ভুয়া সনদ প্রস্তুত করে দেয়।### **৩. জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর পদ্ধতি**তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, এই চক্রের সদস্যরা অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে জালিয়াতি করে থাকে: * **সিগনেচার স্ক্যানিং:** প্রথমে কোনো বৈধ সনদ থেকে মেয়র বা চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর স্ক্যান করে ডিজিটালি সেভ করা হয়। এরপর সফটওয়্যারে নতুন তথ্য বসিয়ে ভুয়া সনদের উপর সেই স্বাক্ষর ডিজিটালভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়। * **ব্লাঙ্ক প্যাড:** অভিযানের সময় দোকান থেকে বিপুল পরিমাণ বিভিন্ন দপ্তরের লোগোযুক্ত ফাঁকা প্যাড (ব্লাঙ্ক প্যাড) জব্দ করা হয়। দালালরা নির্বাচন অফিসের কর্মচারীদের মাধ্যমে এই প্যাডগুলো সংগ্রহ করে অথবা সাইফুল ইসলামের দোকানে নিখুঁতভাবে প্রিন্ট করে নেয়। এর ওপর পরবর্তীতে যেকোনো ধরণের ভুয়া প্রত্যয়নপত্র লিখে খুব সহজেই তা বৈধ হিসেবে চালানো যায়। * **স্মারক নম্বরের জালিয়াতি:** একটি চারিত্রিক বা ওয়ারিশ সনদের সত্যতা মূলত এর স্মারক নম্বর ও তারিখের ওপর নির্ভর করে। নির্বাচন অফিসের কর্মচারীরা (আফসার আহমেদ (আকিব)) দালালদের পুরনো কোনো বৈধ স্মারক নম্বর বা ডামি নম্বর সরবরাহ করে, যা দ্বারা জালিয়াতি করে তৈরিকৃত ভুয়া সনদগুলোতে স্মারক নম্বর বসিয়ে দেওয়া হয়, ফলে এটি সার্ভারেও সহজে ধরা পড়ে না। এবং তার কম্পিউটারের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে দেশের তথ্য যেমন সার্ভার কপি বা সাইন কপি এগুলো বুঝিয়ে দেয়া হয় সাইফুলের কাছে।### **৪. বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ**গত ২২ এপ্রিলের ২০২৬ ইং ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের পর এই সিন্ডিকেটে কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও তাদের ভিত এখনও পুরোপুরি উপড়ে ফেলা যায়নি। সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. তানজিল কবির জানিয়েছেন, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং জনস্বার্থে এই ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। দোকান মালিক সাইফুল ইসলামসহ অন্যান্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।এই শক্তিশালী সম্পর্কের ওপর গড়ে ওঠা চক্রটির কারণে কসবার সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, শুধুমাত্র কম্পিউটার দোকানদারদের নয়, বরং এই জালিয়াতির পেছনের নেপথ্য কারিগর নির্বাচন অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদেরও দ্রুত আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। নতুবা, এই সম্পর্কের জাল আবার শীঘ্রই বিস্তার লাভ করবে।