সিনিয়র রিপোর্টার:
আনিছুরজ্জামান খোকনরাজধানীর উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জনপদ উত্তরা ও তুরাগে মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তুরাগ থানার নলভোগ, বালির মাঠ, ১০ নম্বর সেক্টর, রানা ভোলা, সিরাজ মার্কেট, তিতাসপাড়া, ফুলবাড়িয়া বালির মাঠ, দিয়াবাড়ি, তুরাগ নদীর আশপাশ এবং বিআরটি এলাকার পেছনের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে গোপনে মাদক কেনাবেচা চলছে।স্থানীয়দের ভাষ্য, শুধু খুচরা বিক্রেতা নয় মাদকের সরবরাহ, ক্রেতা সংগ্রহ এবং বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু এলাকায় সন্দেহজনক ব্যক্তিদের আনাগোনা বেড়ে যায় বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।রূপায়ণ সিটি হত্যাকাণ্ডের পর নতুন করে প্রশ্নগত ৬ আগস্ট ২০২৬ রাতে তুরাগের নলভোগ রূপায়ণ সিটি এলাকায় মাদক বিক্রির টাকা কম দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে সজীব হাসান (২৭) নামে এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।অভিযোগ রয়েছে, মাদক বিক্রির ১ হাজার টাকা কম দেওয়া নিয়ে বিরোধের সূত্র ধরে রুবেল নামের এক ব্যক্তির মারধরের ঘটনায় সজীব গুরুতর আহত হন এবং পরে তার মৃত্যু হয়। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ঘটনার সঙ্গে মাদকচক্রের সম্পৃক্ততা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।এই হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয়দের প্রশ্ন তুরাগে মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে কি একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে?যাদের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের অভিযোগস্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, তুরাগের বিভিন্ন এলাকায় রাজু, কালু, মিজান, শামীম, আলাল, জমির, রাকিব, নাঈম, আরিফ, শ্রাবণ ও হীরা নামের কয়েকজনের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে আসা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।‘বিদ্যুৎ’কে ঘিরে অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার অভিযোগএলাকাবাসীর অভিযোগের তালিকায় ‘বিদ্যুৎ’ নামের আরও একজনের নাম উঠে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় ব্যক্তি দাবি করেন, বিদ্যুতের কাছে অবৈধ অস্ত্র রয়েছে এবং তার নেতৃত্বে রূপায়ণ সিটির ভেতরেও মাদক কেনাবেচা চলে।এ অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ও অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। স্থানীয়দের দাবি, শুধু মাদক নয়, মাদক ব্যবসার সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের সংযোগ থাকলে তা পুরো এলাকার নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে।শিপনকে ঘিরে স্থানীয়দের নানা অভিযোগস্থানীয় সূত্রে ‘শিপন’ নামের আরও একজনের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তবে মামলার সংখ্যা, মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং অভিযোগের প্রকৃতি সংশ্লিষ্ট থানার মামলা রেকর্ড ও আদালতের নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, শিপন তুরাগ এলাকায় থেকে একটি মাদক নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ।মাদককে ঘিরে বাড়ছে অন্যান্য অপরাধের আশঙ্কাএলাকাবাসীর অভিযোগ, মাদকের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে চুরি, ছিনতাই, মারামারি, কিশোর গ্যাং এবং অন্যান্য অপরাধের ঝুঁকিও বাড়ছে। মাদকাসক্ত তরুণদের একটি অংশ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় পরিবার ও সমাজে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।বিশেষ করে আবাসিক এলাকা, বস্তি, নির্জন স্থান ও বিভিন্ন গলিতে মাদকের সহজলভ্যতা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।মোবাইল যোগাযোগে ‘হোম ডেলিভারি’র অভিযোগস্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে মাদক কেনাবেচার ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। সরাসরি নির্দিষ্ট স্পটে না বসে মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে নির্দিষ্ট স্থানে মাদক পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে মাদকবিরোধী অভিযানে শুধু দৃশ্যমান স্পট নয়, সরবরাহকারী, অর্থের জোগানদাতা, যোগাযোগকারী ও মূল হোতাদের শনাক্ত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।প্রশাসনের অভিযান আরও জোরদারের দাবিমাদকবিরোধী অভিযানে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাদক উদ্ধার ও গ্রেপ্তার করলেও স্থানীয়দের দাবি, অভিযান যেন বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত না হয়।তাদের মতে, তুরাগ ও উত্তরা এলাকার চিহ্নিত মাদক স্পটগুলোতে নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি, গোপন তথ্য যাচাই, মাদক সরবরাহের উৎস শনাক্ত এবং মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়েও মাদকবিরোধী তৎপরতাএলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগের কথাও উঠে এসেছে।জাতীয়তাবাদী দল ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব মোস্তফা জামান নিজ উদ্যোগে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে মাদকবিরোধী অভিযান ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।এ ছাড়া ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী কার্যক্রমে অংশ নেওয়া এবং প্রশাসনকে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার তাগাদা দিয়েছেন বলে জানা যায়।‘স্পট’ নয়, মূল হোতাদের ধরার দাবিসংশ্লিষ্টদের মতে, মাদক নির্মূলে শুধু খুচরা বিক্রেতা কিংবা বহনকারীদের গ্রেপ্তার করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাদকের পেছনে থাকা মূল সরবরাহকারী, অর্থের জোগানদাতা, নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী এবং অবৈধ সম্পদের উৎস শনাক্ত করতে হবে।একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।এলাকাবাসীর প্রশ্ন ‘মূল নিয়ন্ত্রক কারা?’তুরাগবাসীর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন এত বড় এলাকায় মাদক কীভাবে নিয়মিত সরবরাহ হচ্ছে এবং এর পেছনে থাকা মূল নিয়ন্ত্রক কারা?স্থানীয়দের দাবি, মাদকবিরোধী অভিযানে যদি প্রকৃত মূলহোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা যায়, তাহলে পরিস্থিতির বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব।তাদের প্রত্যাশা, রূপায়ণ সিটি হত্যাকাণ্ডসহ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হবে এবং মাদক ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্র ও সংঘবদ্ধ অপরাধের মধ্যে কোনো যোগসূত্র থাকলে তা উদঘাটন করা হবে।উত্তরা তুরাগকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে এখন প্রয়োজন নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্যভিত্তিক অভিযান, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা।মাদকবিরোধী অভিযান যেন কেবল কয়েক দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, মাদকের মূল শিকড় উপড়ে ফেলতে প্রয়োজন ধারাবাহিক, সমন্বিত ও আপসহীন পদক্ষেপ।