‘
বরগুনা জেলা প্রতিনিধি: ইউসুফ
‘ইউনিক’ নাম ও পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, নিম্নমানের গাড়িতে যাত্রী পরিবহন এবং প্রতিবাদ করলে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে কিছু কাউন্টার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, ‘ইউনিক লাক্সারি’ পরিবহনের নামে টিকিট বিক্রি করা হলেও অনেক যাত্রীর কাছে সেটিকে ‘অরিজিনাল ইউনিক সার্ভিস’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে প্রকৃত পরিবহন সেবা, টিকিটের বৈধতা ও নির্ধারিত ভাড়া নিয়ে চরম বিভ্রান্তিতে পড়ছেন সাধারণ যাত্রীরা।
অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে। যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো রুটে যেখানে ভাড়া প্রায় ৫০০ টাকা হওয়ার কথা, সেখানে ৭৩০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ভাড়া কমানোর অনুরোধ করলে পরিচিতির কথা বলে ২০–৩০ টাকা কম নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন যাত্রী।
টিকিট বিক্রিতে ‘কমিশন বাণিজ্যের’ অভিযোগ
অভিযোগের আরেকটি গুরুতর দিক হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় ৭০০ টাকায় টিকিট বিক্রি করা হলেও সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষকে তুলনামূলক কম অর্থ দেওয়া হচ্ছে এবং বাকি অর্থের একটি অংশ কাউন্টার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কমিশন হিসেবে রেখে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিটি টিকিটে কাউন্টার মাস্টার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত কমিশন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এ অর্থনৈতিক লেনদেনের বিষয়টি সত্য কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট হিসাবপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
ব্র্যান্ডেড ভাড়া, নিম্নমানের গাড়ি?
যাত্রীদের আরও অভিযোগ, অনেক সময় অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের বা লোকাল ধরনের গাড়ি ব্যবহার করে পথে পথে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে যাত্রী পরিবহন করা হলেও আদায় করা হচ্ছে ব্র্যান্ডেড পরিবহনের ভাড়া। ফলে অতিরিক্ত অর্থ দিয়েও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না যাত্রীরা।
একাধিক যাত্রীর অভিযোগ, টিকিট কাটার সময় যে ধরনের সেবার কথা বলা হয়, বাস্তবে গাড়িতে ওঠার পর তার সঙ্গে মিল পাওয়া যায় না। এতে সময়, অর্থ ও ভোগান্তি,তিন দিক থেকেই ক্ষতির মুখে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
আসল-নকল টিকিট নিয়ে বিভ্রান্তি
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ উঠেছে টিকিট নিয়ে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অরিজিনাল ‘ইউনিক সার্ভিস’-এর টিকিটের আদলে বা কাছাকাছি নকশায় টিকিট ব্যবহারের কারণে সাধারণ যাত্রীদের পক্ষে প্রকৃত টিকিট ও অনুমোদিত সার্ভিস শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
যাত্রীদের প্রশ্ন,কোন পরিবহনের টিকিট, প্রকৃত ভাড়া কত, গাড়িটি কোন প্রতিষ্ঠানের এবং কাউন্টারটি আদৌ অনুমোদিত কি না,এসব তথ্য যদি স্পষ্ট না থাকে, তাহলে একজন সাধারণ যাত্রী কীভাবে নিশ্চিত হবেন যে তিনি সঠিক সেবা ও সঠিক ভাড়া দিচ্ছেন?
প্রতিবাদ করলেই দুর্ব্যবহারের অভিযোগ
ভুক্তভোগী যাত্রীদের আরও অভিযোগ, অতিরিক্ত ভাড়া কিংবা গাড়ির মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে কোনো কোনো কাউন্টার কর্মীর কাছ থেকে দুর্ব্যবহার ও অপমানজনক আচরণের শিকার হতে হয়। এমনকি প্রতিবাদকারী যাত্রীর গায়ে হাত তোলার মতো গুরুতর অভিযোগও সামনে এসেছে।
এসব অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা কেবল যাত্রী হয়রানির ঘটনা নয়; একই সঙ্গে ভোক্তা অধিকার, পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং আইনশৃঙ্খলার বিষয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
তৃতীয় পক্ষের কাউন্টার ব্যবস্থায় তৈরি হচ্ছে অনিয়মের সুযোগ?
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো পরিবহনের নিজস্ব বা নিয়ন্ত্রিত কাউন্টার ব্যবস্থার বাইরে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি হলে ভাড়া নির্ধারণ, কমিশন, টিকিটের বৈধতা ও যাত্রীসেবার ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট চক্র অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে কি না, ‘ইউনিক’ নাম ব্যবহার করে যাত্রীদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে কি না এবং টিকিট বিক্রির সঙ্গে কোনো অনিয়মিত কমিশন ব্যবস্থা জড়িত কি না এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা এখন সময়ের দাবি।
কর্তৃপক্ষের নজরদারি জরুরি
যাত্রীদের দাবি, বিষয়টি শুধু একটি পরিবহনের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। বিশেষ করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি খতিয়ে দেখুক।
একই সঙ্গে
কোন কাউন্টার কোন পরিবহনের অনুমোদিত টিকিট বিক্রি করছে;
নির্ধারিত ভাড়া কত;
যাত্রীদের কাছ থেকে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে;
কাউন্টার কমিশনের কাঠামো কী;
টিকিটের বৈধতা ও নকশা কীভাবে যাচাই করা হবে;
কোন ধরনের গাড়ি যাত্রী পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে
এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে প্রকাশ ও যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী যাত্রীরা।
‘ইউনিক’ নামের সুনাম রক্ষায় ব্যবস্থা চান যাত্রীরা
একটি প্রতিষ্ঠিত পরিবহনের নাম ও পরিচিতি ব্যবহার করে যদি কেউ অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, যাত্রী হয়রানি কিংবা নিম্নমানের সেবা দিয়ে থাকে, তাহলে তার দায় কোনোভাবেই সাধারণ যাত্রীদের ওপর চাপানো উচিত নয় এমনটাই মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
তাদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা উদঘাটন, অনুমোদিত ও অননুমোদিত কাউন্টার চিহ্নিতকরণ, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ এবং যাত্রীদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কাউন্টার, পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং টিকিট, ভাড়ার রসিদ, কাউন্টার হিসাব ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
সাধারণ যাত্রীদের প্রত্যাশা একটাই, পরিবহনের নাম যাই হোক, ভাড়া হবে নির্ধারিত, সেবা হবে প্রতিশ্রুত মানের এবং যাত্রী হয়রানির কোনো সুযোগ থাকবে না।