বিশেষ প্রতিবেদন: আনিছুরজ্জামান খোকন
“এক দেশ, এক আইন, এক ব্যবস্থা”এটাই একটি গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো হওয়া উচিত। বাংলাদেশ কোনো ফেডারেল রাষ্ট্র নয়; তাই একই শহরের ভেতরে আলাদা আবাসিক অঞ্চলের জন্য ভিন্ন সুবিধা, বিশেষ প্রশাসনিক আচরণ কিংবা “প্রিভিলেজড জোন” ধারণা নীতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রের আইন ও নাগরিক সেবা যদি সবার জন্য সমান না হয়, তবে সেখানে সামাজিক বৈষম্য ও নাগরিক বঞ্চনা অনিবার্য হয়ে ওঠে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পরিকল্পিত আবাসিক এলাকায় উন্নত নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সুবিধা থাকলেও সাধারণ এলাকাগুলোর বাসিন্দারা একই শহরে থেকেও মৌলিক সেবাবঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। এতে নগরব্যবস্থায় এক ধরনের অদৃশ্য শ্রেণিবিভাজন তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
তবে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, বসুন্ধরা বা অনুরূপ পরিকল্পিত আবাসিক এলাকাগুলোর উন্নত ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা ও সেবা-মান অবশ্যই দেশের অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন ও নগর কর্তৃপক্ষের জন্য একটি কার্যকর মডেল বা রেফারেন্স হতে পারে। উন্নত মডেল অনুকরণ করা কোনো অপরাধ নয়; বরং তা নগর উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এসব মডেল গবেষণা, পরিকল্পনা ও সেবার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত হিসেবেও কাজ করতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে তখনই, যখন উন্নয়নের মডেল ধীরে ধীরে বৈষম্যের প্রতীকে রূপ নেয়। একই শহরে এক শ্রেণির নাগরিক সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করবে, আরেক শ্রেণি ন্যূনতম নাগরিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত থাকবে,এমন বাস্তবতা কোনোভাবেই ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, নাগরিক পরিচয় কখনোই আবাসিক এলাকা, অর্থনৈতিক অবস্থান বা সামাজিক শ্রেণির ভিত্তিতে বিভক্ত হতে পারে না। রাষ্ট্রের চোখে সব নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার সমান হওয়াই সাংবিধানিক চেতনা।
তাই নগর উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মান উন্নয়ন, বিভাজন সৃষ্টি নয়। উন্নত আবাসিক মডেল থাকবে অনুকরণের জন্য, কিন্তু নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিচ্ছন্নতা, যানবাহন ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে সবার জন্য সমানভাবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এখন সময় এসেছে একটি সমন্বিত “জাতীয় নগর ম্যানুয়াল” প্রণয়নের। এই ম্যানুয়াল হবে রাষ্ট্রের নাগরিক সেবার অভিন্ন নীতিমালা, যেখানে শহরের প্রতিটি নাগরিক সমান সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র। নগর ব্যবস্থাপনায় বৈষম্য নয়, সমতা ও জবাবদিহিতাই হতে হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অঙ্গীকার।