বিশেষ প্রতিবেদন: নিজস্ব প্রতিবেদক |কুমিল্লা জেলার প্রতিনিধি নূরে আলম (শাহারিয়ার)তারিখ: ১৩ জুলাই, ২০২৬ | সময়: সন্ধ্যা ৭:০৩চট্টগ্রাম:
টানা ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে চট্টগ্রাম বিভাগে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টিতে জেলার জনজীবন সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে এবং বিগত কয়েক দশকের ইতিহাসে এটিকে অন্যতম বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। পাহাড়ি ঢল ও প্লাবনের কবলে পড়ে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন।দুর্যোগের ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্রবন্যা পরিস্থিতির অবনতির সাথে সাথে ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যানও দ্রুত বাড়ছে। সরকারি ও স্থানীয় তথ্যসূত্র অনুযায়ী পরিস্থিতি নিম্নরূপ:প্রাণহানি: সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগে এখন পর্যন্ত মোট ৫০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছে ভূমিধস এবং পানিতে ডুবে যাওয়ার কারণে।আশ্রয়কেন্দ্রের চিত্র: প্রায় ৩৪,৭২৩ জন মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। এর মধ্যে শুধুমাত্র চট্টগ্রাম জেলাতেই ২২,৬০০ জন মানুষ মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।আবাসন ও অবকাঠামো: বন্যায় প্রায় ৮০,০০০ ঘরবাড়ি আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় নেমে এসেছে বিপর্যয়; প্রায় ৩,৮৪০ কিলোমিটার সড়ক এবং ৩৩৯টি ব্রিজ ও কালভার্ট পানির তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা তলিয়ে গেছে। এছাড়া ৩৪৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনজীবনচট্টগ্রাম নগরীর অধিকাংশ এলাকা, বিশেষ করে নিচু এলাকাগুলো কোমর সমান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর ফলে:চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যকার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে।সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় খাদ্য ও ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছাতে চরম বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।নগরীর বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট পরিষেবা বিঘ্নিত হওয়ার ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।সরকারি ও বেসরকারি ত্রাণ কার্যক্রমপরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন জোর তৎপরতা চালাচ্ছে:উদ্ধার অভিযান: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ এর আওতায় উদ্ধার কাজে সরাসরি অংশ নিচ্ছে।ত্রাণ বরাদ্দ: জরুরিভিত্তিতে ৯২৩ মেট্রিক টন চাল, ৭,২৮১ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২.৭ মিলিয়ন টাকা নগদ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।প্রশাসনিক মনিটরিং: ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি উপজেলায় সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও ত্রাণ বিতরণের সুবিধার্থে ২৪ ঘণ্টার জন্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের কর্মকর্তাদের সকল ছুটি বাতিল করে ত্রাণ কাজে নিয়োজিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।আবহাওয়া পরিস্থিতি ও সতর্কতাবাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপের ফলে এই দীর্ঘস্থায়ী বর্ষণ ঘটছে। আগামী কয়েক দিনেও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকায় পাহাড়ি এলাকাগুলোতে ভূমিধসের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত মানুষদের জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।বর্তমানে দুর্গত মানুষের কাছে বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে, তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত না হওয়া পর্যন্ত ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি পৌঁছানো চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় সুশীল সমাজ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকেও একযোগে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।এই দিখে দেখা যাচ্ছে এলাকার বাসিন্দারা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। একদিকে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট, অন্যদিকে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের ঝুঁকি থাকায় জনসাধারণকে সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দিয়েছে প্রশাসন। চট্টগ্রামসহ ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও দ্রুত ত্রাণ পৌঁছানোই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।