নিজস্ব প্রতিবেদক
সৌদি আরবে কর্মরত এক বাংলাদেশি প্রবাসীকে অপহরণ করে আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। পরিবারের অভিযোগ, প্রবাসী বাবুলকে সৌদি আরবের রিয়াদ বাথা মার্কেট এলাকা থেকে তুলে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে ২৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। উদ্ধারের আশায় পরিবার দফায় দফায় প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করলেও কথিত অপহরণকারীরা এখনো থামেনি। বরং আরও ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাবি করে প্রবাসী ও তার পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি, মারধর, অপহরণ এমনকি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্যরা।অভিযোগকারী প্রবাসীর ছেলে মোঃ নাঈম হোসেন জানান, তার বাবা বাবুল (পাসপোর্ট নম্বর: EM0947736) দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত। গত ৩০ আগস্ট ২০২৬, সৌদি আরবের স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক ১২টা এবং বাংলাদেশ সময় রাত আনুমানিক ৩টার দিকে রিয়াদের বাথা মার্কেটে কর্মরত অবস্থায় মিজান হাওলাদার, পিতা—বারেক হাওলাদার; ফেরদৌস, পিতা—হালিম প্যাদা এবং ইমরান, পিতা—হালিম প্যাদা তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।নাঈমের দাবি, অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার পর তার বাবাকে মারধর করা হয়। এ সময় তার অশ্লীল ভিডিও ধারণ করা, ইকামা এবং হাতের টিপসহি নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরদিন ৩১ আগস্ট সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে পরিবারের সদস্যরা ভয়েস মেসেজের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন। তখন বাবুলকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে পরিবারের কাছে ২৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন নাঈম।দফায় দফায় টাকা পরিশোধ, তবুও শেষ হয়নি মুক্তিপণের দাবিপরিবারের দাবি, প্রবাসীর জীবন বাঁচাতে ও তাকে দ্রুত মুক্ত করার আশায় গত ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে কয়েক দফায় টাকা পাঠানো হয়। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি থেকে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি, সাইনবোর্ড শাখার একটি হিসাবে ৩ লাখ ৪০০ টাকা এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসির দুটি হিসাবে যথাক্রমে ৬ লাখ টাকা ও ৫০ হাজার টাকা পাঠানো হয়।পরিবারের দাবি, শুধু ব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমেই মোট ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি এক আত্মীয়ের কাছ থেকেও ১২ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল, বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ৪ লাখ টাকা, নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন নাঈম।সব মিলিয়ে পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি তার।টাকা দিয়েও মিলছে না মুক্তি, নতুন করে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকার দাবিনাঈমের অভিযোগ, বিপুল পরিমাণ টাকা পরিশোধের পরও তার বাবাকে পুরোপুরি মুক্তি দেওয়া হয়নি। বরং সৌদি আরবের একটি মোবাইল নম্বর এবং কয়েকটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে পরিবারের কাছে আবারও ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে।টাকা না দিলে বাবাকে আরও নির্যাতন করা হবে এবং দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের অপহরণ, মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।দেশে পরিবারের ওপরও হামলার চেষ্টার অভিযোগশুধু সৌদি আরবেই নয়, দেশে থাকা প্রবাসীর পরিবারও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে অভিযোগ করেছেন নাঈম।তার দাবি, অভিযুক্ত ইমরানের ভাই আরাফাত, পিতা, হালিম প্যাদা, কেওয়া বুনিয়া, আমতলী, বরগুনা এলাকায় লোকজন নিয়ে তাদের বাড়িতে গিয়ে তার মায়ের ওপর হামলার চেষ্টা ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন।এ ঘটনায় পরিবারটির মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে জানান নাঈম।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ দাবিনাঈমের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানাসহ স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করা হলেও তারা প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি। মিজান হাওলাদারের ভাই পুলিশে কর্মরত থাকায় আমতলী থানায় অভিযোগ গ্রহণে অনীহা দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।পরিবারের দাবি, সৌদি আরবে বাবুল কোথায় আছেন, তিনি জীবিত ও নিরাপদ আছেন কি না, তা নিয়ে তারা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন। একদিকে মুক্তিপণের নামে বিপুল অর্থ নেওয়া, অন্যদিকে নতুন করে টাকা দাবি এবং দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের হুমকির ঘটনায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।জরুরি উদ্ধারের দাবিপ্রবাসী বাবুলকে দ্রুত শনাক্ত ও উদ্ধার, তার প্রকৃত অবস্থান নিশ্চিত করা, ব্যাংক লেনদেন ও মোবাইল নম্বর/সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য তদন্ত করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা এবং দেশে থাকা পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবারের সদস্যরা।একই সঙ্গে মুক্তিপণের অর্থ কোন কোন হিসাবে গেছে, কারা সেই অর্থ গ্রহণ করেছে এবং অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িতদের ভূমিকা কী,তা খতিয়ে দেখতে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত মিজান হাওলাদার, ফেরদৌস, ইমরান ও আরাফাতের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।