মোঃ বজলুর রহমান,
কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ করলেও মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় সেই সরকারি সার বিতরণ ব্যবস্থা নিয়ে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে বিভিন্ন এলাকায় সরকারি সার ডিলারশিপ, নির্ধারিত এলাকার বাইরে সার সরবরাহ, খুচরা ডিলারদের পর্যাপ্ত সার না দেওয়া এবং অনুপযুক্ত গুদামে সার সংরক্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এতে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে সার নিয়ে ভোগান্তি ও কৃত্রিম সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।সাটুরিয়া উপজেলার বরাইদ ইউনিয়নের ছনকা বাজারে ‘মেসার্স ছাত্তার ট্রেডার্স’ নামে বিসিআইসি পাইকারি সার ডিলারের বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এর প্রোপ্রাইটর মো. আব্দুস ছাত্তার। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর পরিবারের সদস্যরাও মানিকগঞ্জ সদর ও দৌলতপুরের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি সার ডিলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।স্থানীয়দের অভিযোগ, ছনকা বাজারের ডিলারশিপটি মূল ডিলারের পরিবর্তে অন্য একজনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। সার সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত গুদামটিও অনুপযুক্ত। নিম্নমানের টিনের ঘরে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে সার রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই গুদাম থেকেই বিভিন্ন খুচরা ডিলারের কাছে সার সরবরাহ করা হয় বলেও দাবি স্থানীয়দের।আরও অভিযোগ, ছনকা বাজার সাটুরিয়ার প্রান্তবর্তী এলাকায় হওয়ায় বরাইদ ইউনিয়নের অনেক কৃষকের জন্য সেখান থেকে সার সংগ্রহ করা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। একদিকে টাঙ্গাইল জেলার সীমানা, অন্যদিকে দৌলতপুর উপজেলার সীমানা থাকায় এলাকার কৃষকদের বড় অংশ স্থানীয় বাজারের পরিবর্তে আশপাশের বাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ।স্থানীয়দের দাবি, এ সুযোগে বরাইদ ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দকৃত সার অন্য এলাকার খুচরা ডিলারদের কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে দৌলতপুর উপজেলার কলিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন ডিলারের কাছে বেশি দামে সার বিক্রি করে বরাইদ ইউনিয়নে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগও রয়েছে।এদিকে দৌলতপুর উপজেলার কলিয়া ইউনিয়নের কয়েকজন খুচরা সার বিক্রেতার অভিযোগ, আব্দুস ছাত্তারের ছোট ভাই মো. আব্দুর রাজ্জাক সেখানে সরকারি সার ডিলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের দাবি, প্রায় সাত মাস ধরে স্থানীয় খুচরা ডিলারদের নিয়মিত সার সরবরাহ করা হচ্ছে না। ফলে তাঁরা কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার দিতে পারছেন না।অভিযোগকারীদের ভাষ্য, গত মাসে বরাদ্দের মাত্র ১৫ বস্তা সার দেওয়া হলেও তা তাঁদের প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অতি সামান্য। চলতি মাসের বরাদ্দের সারও অনেক খুচরা ডিলারের গুদামে পৌঁছেনি। বিষয়টি কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তাদের জানানো হলেও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।শুধু তাই নয়, অভিযোগ রয়েছে—আব্দুস ছাত্তারের ছেলে মানিকগঞ্জ সদর পৌর এলাকায়ও সরকারি সার ডিলারশিপ পরিচালনা করছেন। অর্থাৎ একই পরিবারের বাবা, ভাই ও ছেলে বিভিন্ন এলাকায় সরকারি সার বিতরণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে।এখানেই প্রশ্ন উঠেছে, সরকার যখন সার বিতরণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধের জন্য নীতিমালা করেছে, তখন একই পরিবারের একাধিক সদস্য কীভাবে বিভিন্ন এলাকায় সরকারি সার ডিলারশিপ পরিচালনা করছেন?কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত নীতিমালায় ডিলারের কার্যএলাকা, বিক্রয়কেন্দ্র, গুদাম এবং সার বিতরণের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। সরকারি ভর্তুকির সার নির্ধারিত ব্যবস্থার বাইরে সরিয়ে নেওয়া কিংবা কৃষকের পরিবর্তে অন্য এলাকায় সরবরাহ করা হলে তা সার বিতরণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও কৃষকের ন্যায্য অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।স্থানীয় কৃষকদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। একই পরিবারের সদস্যদের ডিলারশিপের বৈধতা, তাঁদের নিয়োগের সময়কার নীতিমালা, মাসভিত্তিক সার বরাদ্দ ও উত্তোলনের হিসাব, খুচরা ডিলারদের সরবরাহের তথ্য এবং কোন এলাকায় কত সার বিক্রি হয়েছে—এসব তথ্য যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।একই সঙ্গে ছনকা বাজারের গুদামটি সরকারি সার সংরক্ষণের উপযোগী কি না, নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্রের বাইরে সার রাখা বা বিক্রি হচ্ছে কি না এবং বরাইদ ইউনিয়নের বরাদ্দ অন্য এলাকায় সরবরাহ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়েও সরেজমিন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।সরকারি ভর্তুকির সার কোনো ডিলারের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, এটি কৃষকের অধিকার। তাই অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং অভিযোগ অসত্য হলে তা পরিষ্কারভাবে জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি উঠেছে।