স্টাফ রিপোর্টার : আমিনুর ইসলাম
মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার জিয়ানপুর ইউনিয়নের আবুডাঙ্গা ও পংকিরচা এলাকায় কালীগঙ্গা নদীতে ফসলি জমির পাশে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু-মাটি উত্তোলনের অভিযোগে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে উপজেলা প্রশাসন।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। ছয়টি ড্রেজারের পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১২০ মিটার ড্রেজার পাইপ অপসারণ করা হয়েছে এবং ড্রেজার ব্যবসায়ী মোঃ নান্নুকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় একাধিক ড্রেজার বসিয়ে কালীগঙ্গা নদী থেকে বালু-মাটি উত্তোলন করা হচ্ছিল। পাইপের মাধ্যমে উত্তোলিত বালু-মাটি বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো বলেও জানান তারা।
এতে নদীর তীর ও আশপাশের ফসলি জমি ভাঙনের মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে বলে দাবি কৃষকদের। ড্রেজার দিয়ে মাটি উত্তোলনের কারণে ইতোমধ্যে একটি বসতবাড়ি ভেঙে গেছে বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ। আরও কয়েকটি বসতবাড়ি ও আবাদি জমি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে দাবি তাদের।
দীর্ঘদিন ধরে চলা কথিত অবৈধ ড্রেজার কার্যক্রম নিয়ে জাতীয় দৈনিক সরেজমিন, জননী টিভি ও জাতীয় দৈনিক বিশ্ব মিডিয়াসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে বলে জানা গেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেয়। অভিযানের বিষয়ে জাতীয় দৈনিক সরেজমিনের বার্তা গণমাধ্যমকর্মী মুঠোফোনের মাধ্যমে দৌলতপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে অবহিত করেন বলেও জানা গেছে।
পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হয়। ছয়টি ড্রেজারের পয়েন্টে পরিচালিত এ অভিযানে নদীর তীর থেকে প্রায় ১২০ মিটার ড্রেজার পাইপ অপসারণ করা হয় এবং ড্রেজার ব্যবসায়ী মোঃ নান্নুকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দৌলতপুরের ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে অবৈধ ড্রেজার কার্যক্রম বন্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি উঠে আসে।
এদিকে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অবৈধ ড্রেজার বন্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বলে জানা গেছে। প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া কোনো ব্যক্তি ড্রেজার পরিচালনা করলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তবে এর আগে ড্রেজার মালিকদের একজন দাবি করেছিলেন, প্রশাসনের অনুমতি ও সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করেই তারা ড্রেজার ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তিনি সাংবাদিকদের ম্যানেজ করার বিষয়েও বক্তব্য দেন এবং বলেন, ১৭ বছর ব্যবসা করিনি, এখন আমরা করব না তো কে করবে।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, অবৈধ ড্রেজার ব্যবসার কোনো অনুমতি দেওয়া হয় না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চকমিরপুর ইউনিয়নের যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃনান্নু মিয়া, আমজাদ মেম্বার ও মোঃশরিফের নেতৃত্বে ওই ড্রেজার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল। এছাড়া ড্রেজার ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ের নেতাদের নাম ভাঙিয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের বিষয়।
এ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক হাজী গোলাম সালাউদ্দিন সেলিম বলেন, দলের কোনো ব্যক্তি এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে দল কোনো দায়ভার নেবে না। তিনি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া বা নিষিদ্ধ স্থান থেকে বালু-মাটি উত্তোলন আইনবিরুদ্ধ। নদীর তীর ভাঙন, কৃষিজমি, পরিবেশ-প্রতিবেশ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে সেখানে বালু-মাটি উত্তোলনের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।
আইনের ধারা ১৫ অনুযায়ী নিষিদ্ধভাবে বা অনুমতি ছাড়া বালু-মাটি উত্তোলনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। অপরাধে ব্যবহৃত ড্রেজার ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম জব্দ বা বাজেয়াপ্তের বিধানও রয়েছে।
এদিকে প্রশাসনের অভিযানে এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। দীর্ঘদিনের অভিযোগের পর নদী ও কৃষিজমি রক্ষায় দ্রুত অভিযান পরিচালনা করায় স্থানীয় কৃষক ও এলাকাবাসী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
এলাকাবাসী বলেন, শুধু একদিনের অভিযান নয়, ভবিষ্যতেও যেন অবৈধ ড্রেজার আবার নদীতে বসতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। তারা অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রাখার দাবি জানান।
স্থানীয়দের দাবি, ড্রেজারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ি ও কৃষিজমির বিষয়টিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরেজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ ড্রেজার পরিচালনার অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন তারা। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রশাসনের দ্রুত তৎপরতা এবং ছয়টি ড্রেজারের পয়েন্টে অভিযান পরিচালনা করাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, কালীগঙ্গা নদী, নদীর তীর, ফসলি জমি ও বসতবাড়ি রক্ষায় প্রশাসনের এই অভিযান ও নজরদারি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।