আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি আসন্ন ত্রেরোদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে মানুষের মধ্যে কাজ করছে নানা ধরনের ধ্যান ধারণা। জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকলেও অনেকেই গণভোটের বিষয়ে সন্দিহান। কীসের ওপর গণভোট, তা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন রেখেছেন। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘনীভূত হচ্ছে এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত। একদিকে বাজছে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামা, অন্যদিকে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে এক ভিন্ন বাস্তবতার ‘গণভোট’। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। চায়ের দোকান থেকে পাড়া-মহল্লার সবখানেই ভোটের আলোচনা থাকলেও সেখানে সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ যতটা, গণভোট নিয়ে ধোঁয়াশা যেন ততটাই স্পষ্ট।
মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, ভোটারদের বড় একটি অংশ এখনও জানেই না গণভোটটি আসলে কীসের ওপর। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে উৎসব থাকলেও গণভোটের প্রচারণা কার্যত অনুপস্থিত। একদিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তারিখ হওয়া সব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জোরালো আগ্রহ নেই। একমাত্র এনসিপিরই আগ্রহ বেশী। কিন্তু এর আগে গণভোট নিয়ে জামায়াত ইসলামের যে ভূমিকা ছিল এখন আর সেই রকম নেই। তারপরও জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের জোট গণভোটের পক্ষে প্রচার চালালেও বিএনপিসহ মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর আগ্রহ কম।
সংসদীয় আসনের প্রার্থীরা এখন দিনরাত এক করে ফেলছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে। কিন্তু অধিকাংশ প্রার্থীর প্রচারণায় ‘গণভোট’ আচারভ্রষ্ট। প্রার্থীরা কেবল নিজের নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে নিজের প্রতীকে ভোট চাচ্ছেন। এমনকি, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর হেভিওয়েট প্রার্থীরাও এ বিষয়ে নীরব। তবে ইদানীং বিএনপি জোরালো প্রচারণা না চালালেও সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ে অনুষ্ঠানে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গণভোটে ‘না’ দেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘একই দিনে গণভোট এবং জাতীয় নির্বাচন আমরা চেয়েছিলাম। সেভাবেই হয়েছে। সংস্কার বিষয়ে যে গণভোট হচ্ছে- সেগুলো আমরাই বহু আগে ২০১৬ এবং ২০২৩ সালে ৩১ দফার মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরেছিলাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। সেখানে ‘না’ বলার কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।’
এদিকে এ নিয়ে আবার শঙ্কাও দেখছেন অনেকে। গণভোটে ‘না’ জিতলে বড় সংকটে পড়বে দেশ। প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি হলো দেশে বড় ধরনের গণতান্ত্রিক রূপান্তর। এর মধ্যে রয়েছে-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করা, নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ, আইনের শাসন এবং প্রশাসনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অন্যতম। কিন্তু গণভোটে ‘না’ জয়যুক্ত হলে সেই রূপান্তর আর হবে না। বড় ধরনের সংকটে পড়বে দেশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এমন মতামতই ব্যক্ত করেন। তাদের মতে, ‘না’ জয়ী হলে জুলাই বিপ্লব এবং অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। নির্বাচিত সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করার যুক্তি খুঁজে পাবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘না’ জয়যুক্ত হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। কারণ সরকার ইতোমধ্যে প্রচারণা শুরু করেছে। আগামী চার সপ্তাহ আরও ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালানো হবে। রাজনৈতিক দলগুলোও ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে মানুষকে উৎসাহিত করছে।
দেশে প্রথমবারের মতো একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের চূড়ান্ত আইনি ভিত্তি দিতে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি এই ভোট অনুষ্ঠিত হবে। তবে ইতোমধ্যে নানা চ্যালেঞ্জ ও শঙ্কায় রয়েছে গণভোট। এর মধ্যে রয়েছে-গণভোটের প্রশ্নে সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয় এমন জটিল বাক্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এতে চারটি প্রশ্ন থাকলেও উত্তর দেওয়ার সুযোগ থাকছে একটি; অর্থাৎ হ্যাঁ বা না বলতে হবে। তবে গণভোটের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা এবং অভ্যুত্থানের বিপক্ষে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি গণভোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সিপিবির ত্রিদীব সাহা জানিয়েছেন, গণভোটের অনেক বিষয়ে তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। আর বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা রাফিকুজ্জামান ফরিদ সরাসরি বলেই দিলেন, “গণভোটের বেশিরভাগ প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ।” আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও গোপনে গোপনে না ভোট দেওয়ার পক্ষে কাজ করছেন বলে জানা যায়।
বিভাগীয় ও জেলা শহরে এ নিয়ে রয়েছে নানা ধরনের বিভ্রান্তি। ময়মনসিংহ, রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম, রংপুর ও সিলেট, প্রায় সব বিভাগেই ভোটারদের বক্তব্যে একই সুর। গণভোট সম্পর্কে ধারণা নেই, প্রচারণাও চোখে পড়ছে না। অনেকেই জানেন না, গণভোটে কী বিষয়ে ভোট দিতে হবে বা ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’-এর অর্থ কী।
ময়মনসিংহের ভোটার শাহিন মিয়া ও শহীদ মিয়াদের দাবি, গণভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ধোঁয়াশা রয়েছে। তারাকান্দার হাসান মাহবুব মনে করেন, জুলাই চেতনা বাঁচাতে হলে নির্বাচন কমিশনকে আরও কার্যকর হতে হবে।
চট্টগ্রামের বন্দর নগরীতেও নেই কোনও জোরালো প্রচার। ভোটার জয়নাব বেগম বা রফিকুল ইসলামদের একটাই কথা তারা কেবল সংসদীয় প্রার্থীদের চেনেন, গণভোট চেনেন না। মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান আক্ষেপ করে বলেন, “জিয়াউর রহমানের আমলের সেই হেলিকপ্টারে লিফলেট বিলি আর মাইকিংয়ের প্রচার এবার কোথায়?”
বরিশাল নগরীর কাউনিয়ার শোয়াইব সাকিরের অভিযোগ আরও মৌলিক। তিনি শুনেছেন গণভোটে একাধিক বিষয়ে একসঙ্গে মত দিতে হবে। তার প্রশ্ন, “আমি সব বিষয়ে একমত না হলে কেন একভাবে হ্যাঁ বা না বলব?” সচেতন নাগরিক কমিটির রফিকুল আলম তো এই গণভোটকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও দাবি করেছেন।
খুলনার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ফয়সল কাদের গণভোটের প্রচারণার সূত্রে জাতীয় নির্বাচনের প্রচার না করার জন্য কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এদিকে, রংপুরের প্রত্যন্ত এলাকার ভোটাররা বলছেন, বড় দলগুলোর প্রার্থীরা ভোট চাইতে আসলেও গণভোটের নামটিও মুখে নিচ্ছেন না।
বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, গণভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হলেও এর উদ্দেশ্য ও প্রভাব ভোটারদের কাছে পরিষ্কারভাবে পৌঁছায়নি। কেউ কেউ বলছেন, একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, একই দিনে দুটি ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী হলেও প্রচারণার অভাবে তা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসানের মতে, অতীতে গণভোটের জন্য যে ধরনের ব্যাপক প্রচার (হেলিকপ্টার থেকে লিফলেট বিতরণ, রেডিও-টিভিতে জোরালো প্রচার) দেখা যেত, এবার তার ছিটেফোঁটাও নেই। ফলে ভোটারদের বড় একটি অংশ বিভ্রান্ত হয়ে কেন্দ্র থেকে ফিরে আসতে পারে।
এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘গণভোটে না জয়যুক্ত হওয়ার কোনো আশঙ্কা আমি দেখছি না। কারণ দেশের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে। তারা ফ্যাসিবাদী শাসনে আর ফিরে যেতে চায় না। তিনি বলেন, ‘গণভোট নিয়ে সরকার সারা দেশে প্রচারণা শুরু করেছে। আমি নিজেই রাজশাহী এবং বরিশালে গিয়েছি। সেখানে ব্যাপক সাড়া পেয়েছি।’ তার মতে, এই সরকারের মূল কাজ হলো রাষ্ট্র সংস্কার। এ লক্ষ্যেই ১১টি কমিশন করা হয়েছিল। সেই কমিশনের রিপোর্টের আলোকে তৈরি হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ। ফলে গণভোটকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এছাড়া ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোও কথা বলছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলেছেন। এছাড়া জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন এবং এবি পার্টিসহ সব রাজনৈতিক দল পক্ষে কথা বলছে। এখন পর্যন্ত কারও বিরোধিতার কথা আমি শুনিনি। তিনি জানান, রাজনৈতিক দলগুলো বর্তমানে আসন সমঝোতা এবং অন্যান্য ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত। আগামী ২২ জানুয়ারির পর রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান আরও স্পষ্ট হবে। তবে তিনি বলেন, পালিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসররা নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করবে। তারা সব কিছুতেই বাধা দেয়। যেহেতু তাদের রাজনৈতিক দল হিসাবে বিবেচনায় নেওয়া হয় না, তাই তাদের প্রচারণাকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, সরকার আশঙ্কা করছে, রাজনৈতিক দলগুলো প্রচারণা না চালালে মানুষ গণভোটের ব্যাপারে আগ্রহী হবে না। দলীয় সমর্থকদের কেউ কেউ হয়তো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিলেও গণভোট দেবে না। যে কারণে সরকার প্রচারণা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোরও এই প্রচারণা চালানো উচিত। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এমন যদি হয় জাতীয় নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৬৫ শতাংশ, কিন্তু গণভোট পড়েছে ৪০ শতাংশ বা তার কাছাকাছি। এ ধরনের পরিস্থিতি দেশে রাজনৈতিক সংকট তৈরি করবে। তিনি আরও বলেন, গণভোট মূলত জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট। অর্থাৎ জুলাই বিপ্লবের ফলে দেশে যে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের চিন্তা করা হচ্ছে, ‘না ভোট’ জয়যুক্ত হলে সেই রূপান্তর হবে না। জুলাই বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি হলো-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিমূলক করা, জনগণের অংশগ্রহণকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া, আইনের শাসন এবং প্রশাসনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অন্যতম। কিন্তু হ্যাঁ জয়যুক্ত না হলে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, গণভোটের নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কারণ বাংলাদেশে এর আগে কখনো গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একইদিনে হয়নি। ফলে এবারের গণভোটের বিষয়টি কঠিন ও জটিল একটি কাজ। ৪টি প্রশ্ন, কিন্তু একটি উত্তর দিতে হবে। বিষয়গুলো টেকনিক্যাল। কেউ যদি তিনটির সঙ্গে একমত কিন্তু একটির সঙ্গে দ্বিমত আছে; তাহলে তিনি কী করবেন? আবার কেউ দুটির সঙ্গে একমত। অর্থাৎ ভোটাররা এখানে দ্বিধান্বিত বা বিভ্রান্ত হবে। তার মতে, দেশের সাধারণ ভোটারদের জ্ঞান এখনো ওই পর্যায়ে পৌঁছেনি। ফলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে যতই প্রচারণা চালানো হোক, মানুষকে বিষয়গুলো বোঝানো কঠিন হবে। তিনি বলেন, অন্তত তিন ধরনের ভোটার আছে। শহরের এবং শিক্ষিত কিছু ভোটার বুঝে ভোট দেবে। কিছু আছে, দল যা বলবে, সেটাই করবে। আবার কিছু ভোটার আছে, না বুঝে ভোট দেবে, অথবা ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। তিনি বলেন, গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিভক্তি রয়েছে। যেহেতু এই ভোটের সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের সম্পর্ক রয়েছে, তাই প্রকাশ্যে অভ্যুত্থানের বিপক্ষে কেউ কথা বলছেন না। কিন্তু চুপে চুপে সমর্থকদের বলছেন, আমরা এসবের খুব বেশি পক্ষে না। অপরদিকে আরেকটি দল প্রকাশ্যেই বলছে, আগামীতে জুলাই সনদ অনুসারে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। সেক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে হবে। অধ্যাপক আইনুল ইসলাম মনে করেন, গণভোটে না জয়যুক্ত হলে জুলাই অভ্যুত্থানসহ পুরো বিষয়টি চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে।