।সিলেট কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি। সালাউদ্দিন রানা।সুনামগঞ্জের ছাতকে মসজিদের তহবিলের ৫ লক্ষ টাকা আত্মসাতের প্রতিবাদ করায় ফজল মিয়া (৫০) নামের এক কৃষককে ফিল্মি স্টাইলে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও বুকে বর্শা (সুলফি) গেঁথে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে স্থানীয় একটি চিহ্নিত সন্ত্রাসী চক্র। তিনি পাঁচ সন্তানের জনক এবং একজন সমাজ সচেতন মানুষ ছিলেন।গত ২৮ ফেব্রুয়ারি (শনিবার) সকাল ১০টার দিকে ছাতক থানাধীন পুরান নোয়াকুট গ্রামের দক্ষিণ পাশের সড়কে এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নিহতের ভাই আলতাব হোসেন বাদী হয়ে ৪৬ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। প্রধান আসামি মাসুক মিয়াকে এরই মধ্যে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।এলাকাবাসী, স্থানীয় প্রতিনিধি ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, প্রায় পাঁচ-ছয় মাস আগে এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী মাসুক মিয়ার নেতৃত্বে একদল দুর্বৃত্ত পুরান নোয়াকুট গ্রামের জামে মসজিদের ক্যাশিয়ার আব্দুল করিমের কাছ থেকে মসজিদের ৫ লক্ষ টাকা জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়। এরপর মাসুক নিজেকে ক্যাশিয়ার ঘোষণা করে। স্থানীয় সাবেক মেম্বার শফিক মিয়া জানান, মসজিদের ওজুখানা নির্মাণের এই টাকা নিয়ে প্রায় আট মাস ধরে মাসুকের সঙ্গে পঞ্চায়েতের বিরোধ চলছিল। মুরুব্বিরা বারবার মীমাংসার চেষ্টা করলেও কাজ হয়নি।এই ঘটনার পর এলাকায় পঞ্চায়েত বসলে নিহত ফজল মিয়া অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং মসজিদের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য জোরালো অবস্থান নেন। এতেই তিনি খুনি চক্রের চক্ষুশূল হন এবং তাকে হত্যার ছক কষা হয়।২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে মাসুক ও তার সহযোগীরা কালা মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে মারধর করে। তাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে ফজল মিয়া তার ভাই ও এলাকার কয়েকজনকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে পুরান নোয়াকুট সড়কে আসামাত্রই আগে থেকে ওত পেতে থাকা মাসুক, নুরই, হারুন, আনোয়ার, জুনাইদসহ প্রায় অর্ধশতাধিক সন্ত্রাসী রামদা, সুলফি, ড্যাগার, বল্লম ও লোহার পাইপ নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, খুনি মাসুকের নির্দেশ পেয়েই ডাকাত হারুন মিয়া তার হাতে থাকা ধারালো সুলফি (বর্শা জাতীয় অস্ত্র) ফজল মিয়ার বুকের ডান পাশে সজোরে ঢুকিয়ে দেয়। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে নুরই মিয়া রামদা দিয়ে, আনোয়ার জিআই পাইপ দিয়ে এবং মাসুক মিয়া বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে।এ সময় চোখের সামনে ভাইয়ের মৃত্যুযন্ত্রণা দেখে আলতাব হোসেন ও অন্যরা এগিয়ে গেলে তাদের ওপরও হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে খুনিরা। সন্ত্রাসীদের হামলায় আব্দুল খালিক, মনির উদ্দিন, আনোয়ার, আব্দুল করিম, আব্দুল আলিম, ইসমাইল, চান মিয়া ও বাবুল মিয়া মারাত্মকভাবে জখম হন। রামদার কোপে কারও মাথায় ৮টি পর্যন্ত সেলাই লেগেছে এবং কয়েকজনের হাড় ভেঙে গেছে।অনুসন্ধানে জানা যায়, ফজল মিয়াকে যারা খুন করেছে, তারা কোনো সাধারণ অপরাধী নয়। হত্যার সময় প্রধান আসামি মাসুক দম্ভ করে বলেছিল, “জমীরকেও মারিয়া শেষ করছি, কোন কিছু হইছেনা আজকে তোরে জানে শেষ করমু।” কে এই জমীর? আমাদের হাতে আসা ২০০১ সালের ছাতক থানার একটি এফআইআর (মামলা নং-০৮, তারিখ: ০৮/০২/২০০১) থেকে জানা যায়, এই জমীর আলী ছিলেন পুরান নোয়াকুট গ্রামেরই বাসিন্দা। ২০০১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে এই মাসুক মিয়া চুরি করতে গিয়ে জনতার হাতে ধরা পড়েছিল। তখন তাকে ছাড়িয়ে নিতে তার বাহিনী হামলা চালায়। সে সময় বাধা দিলে এই নুরই মিয়া তার হাতে থাকা ধারালো ছোরা (কিরিচ) দিয়ে জমীর আলীর বগলের নিচে ঢুকিয়ে নির্মমভাবে তাকে খুন করে। সেই মামলায় মাসুক (১নং আসামি) ও নুরই (৩নং আসামি) দণ্ডবিধির ৪৫৭/৩৮০/৩৪১/৩০২/৩৪/১১৪ ধারায় (চুরি, অবৈধ অবরোধ ও হত্যা) অভিযুক্ত দাগি খুনি। ২৫ বছর আগের সেই খুনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই তারা এবার ফজল মিয়াকে খুন করেছে।অন্যদিকে, বুকে বর্শা মারা ৩নং আসামি হারুন মিয়ার বিরুদ্ধে ২০০৫ সালের ১৩ এপ্রিল কোম্পানীগঞ্জ থানায় একটি ডাকাতি মামলা হয় (মামলা নং-০৯)। সেই মামলায় সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত গত ২০১১ সালের ৩০ মে রায় প্রদান করেন (দায়রা মামলা নং-৩৬৬/২০০৮)। রায়ে হারুন মিয়াকে দণ্ডবিধির ৩৯৫/৩৯৭ ধারায় (মারাত্মক অস্ত্রসহ ডাকাতি) ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এমন দাগি খুনি ও সাজাপ্রাপ্ত ডাকাতরা কীভাবে জাদুবলে এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়, তা এক বিরাট রহস্য।কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর ২৮ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে ডা. হাসনিন ফজল মিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন। ছাতক থানার এসআই (নিঃ) নাজমুল হক মামুনের তৈরি সুরতহাল রিপোর্টে নিহতের বুকের ডান পাশে ছিদ্র জখম, ডান হাতের কনুইয়ের ওপরে জখম, পিঠে ফোলা জখম এবং নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝরার প্রমাণ পাওয়া গেছে।ময়নাতদন্ত শেষে গত ১ মার্চ আসরের নামাজের পর পুরান নোয়াকুট কবরস্থানে বাবার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় প্রতিবাদী ফজল মিয়াকে। তিনি স্ত্রী, ৩ মেয়ে ও ২ ছেলে রেখে গেছেন। মসজিদের পবিত্র সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে বাবাকে হারিয়ে সন্তানরা আজ পাগলপ্রায়।ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, “ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রধান আসামি মাসুক পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। নিহতের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া চলছে এবং পুরো ঘটনাটি কঠিন তদন্তাধীন রয়েছে।”