বিশেষ প্রতিবেদন,বরগুনা
বরগুনা জেলার আমতলী উপজেলার চুনাখালী গ্রামে একসময় দেশজুড়ে পরিচিত ছিল নৌকার গ্রাম নামে। চুনাখালীতে কাঠের তৈরী নৌকা বরগুনার জনপদ হয়ে দেশের নানা প্রান্তের নদ নদীতে চলাচল করেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানকার মানুষের প্রধান জীবীকা ছিল কাঠের তৈরী নৌকা। সময়ের স্রোতে কাঠের মূল্য বৃদ্ধিতে কাঠের নৌকার ঐতিহ্য বিলীন হতে চলছে।
জানা যায়, ওই গ্রামের প্রায় ৯ শতাধিক পরিবার কাঠের নৌকা তৈরী করে এলাকার চাহিদা পূরণ করে পার্শ্ববর্তি জেলায় নৌকা বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়েছে। কালের বিবর্তনে কাঠের মূল্য বৃদ্ধি শ্রমিকের অভাব, নদ নদী শুকিয়ে যাবার কারনে নৌকার চাহিদা অনেকাংশে কমে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও শতাধিক পরিবার বংশানুক্রমে নৌকা তৈরির পেশায় যুক্ত ছিল। বর্ষা মৌসুমে এই শিল্পে বছরে কোটি টাকার নৌকা বিক্রি করেছে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ নৌকা কিনতে আসতেন। গ্রামে ছিল উৎসব মুখর পরিবেশ। বর্তমানে কাঠের মূল্যবৃদ্ধি, কাঠের সংকট, পুঁজি সংকট, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং ফাইবার ও ইঞ্জিনচালিত নৌযানের প্রতিযোগিতায় ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌকার বাজার দ্রুত সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
চুনাখালীর স্থানীয় বাজারের ঘাটগুলো হয়ে উঠত কর্মচাঞ্চল্যে ভরপুর। কাঠ কাটা, পেরেক ঠোকার শব্দে মুখর থাকত নদীপাড়। কারিগরদের ব্যস্ত হাতের ছোঁয়ায় গড়ে উঠত একের পর এক নৌকা। এখন আর সেই দৃশ্য অতীত। কাজের অভাবে অনেক কারিগর মাসের পর মাস বেকার সময় পার করছেন। ওই গ্রামে এক সময় তৈরি হতো মাছ ধরার ট্রলার, যাত্রীবাহী নৌকা, ধান টানার নৌকা ও পণ্য পরিবহনের বড় কাঠের বোট। গ্রামীণ জীবনে নৌকা ছিল শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং জীবন ও সংস্কৃতির অংশ। বর্ষাকালে জলমগ্ন এলাকায় নৌকাই ছিল মানুষের ভরসা।
আমতলীর চুনাখালী ও আশপাশের বহু নদ নদী খাল বিল এখন ভরাট হয়ে নাব্যতা হারিয়েছে। নিয়মিত খাল খনন না থাকায় নৌকা চলাচল ও মাছ ধরা দুটোই কমেছে। এর পাশাপাশি আধুনিক ফাইবার বোট ও ইঞ্জিন চালিত ট্রলারের ব্যবহার বহুগুন বেড়ে যাওয়ায় কাঠের নৌকার চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
গ্রামের প্রবীণদের মতে, ১০/১২ বছর আগেও যেখানে শতাধিক পরিবার এই নৌকা তৈরী পেশায় যুক্ত ছিল। বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ১০ থেকে ১৫ পরিবারে। জীবীকার তাগিদে বাকিরা অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
চুনাখালীর প্রবীণ নৌকা কারিগর আব্দুল জলিল বলেন, আগে বছরের অর্ধেক সময় নৌকার কাজ থাকত। এখন মাসের পর মাস অর্ডারই আসে না। কাঠের দাম বেড়েছে, মানুষের ক্রয় ক্ষমতাও কম।’
নৌকা তৈরিতে ব্যবহৃত চাম্বল, মেহগনি, রেইনট্রি, সেগুন, গামার ও কড়ই কাঠের দাম গত পাঁচ বছরে তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি, রং লোহার খরচও বেড়েছে বহুগুণ।
কারিগর মজিবর রহমান বলেন, ‘‘আগে ৩০ হাজার টাকায় মাঝারি নৌকা বানাতে পারতাম। এখন শুধু কাঠ আর লোহার দামেই সেই টাকার বেশি লাগে। তিনি বলেন,অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে। অনেক তরুণ অন্য কাজের সন্ধানে পাড়ি জমাচ্ছেন ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে। কেহ চাকরী করছেন।
ওই গ্রামের সোহাগ হাওলাদার বলেন, ‘বাপ দাদারা এই পেশায় সংসার চালিয়েছেন। কিন্তু এখন নৌকা বানিয়ে টিকে থাকা কঠিন। লাভ তো নেই, উল্টো ঋণের বোঝা বাড়েছে। তাই আমরা এই পেশা ছেড়ে দিয়েছি।
নৌকার মিস্ত্রী মোজাম্মেল মাদুববর বলেন, এনজিও থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে নৌকা তৈরীর কাজ শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত সুদের চাপে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের দাবি, সরকারি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে এই শতবর্ষী ঐতিহ্য নৌকা তৈরীর পেশা রক্ষা করা সম্ভব। নৌকা শিল্পকে স্থানীয় হস্তশিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল ও বাজার সহায়তা দিলে চুনাখালী নৌকা বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
নৌকার মিস্ত্রি মজিবর শেখ বলেন, ‘নৌকা আমাদের জীবনের অংশ। হয়তো একদিন ব্যবসা থাকবে না, কিন্তু এই কাজ আমরা ছাড়ব না।
চুনাখালী শুধু একটি গ্রাম নয়। এটি শতবর্ষী এক ঐতিহ্য ও জীবন ধারার নাম। সময় মতো উদ্যোগ না নিলে বাংলাদেশের নদী মাতৃক সংস্কৃতির একটি মূল্যবান অধ্যায় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই বাড়বে।