কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি।
সালাউদ্দিন রানা।
হোটেল থেকে ফেরার পথে বা ঘুমের থেকে ডেকে গ্রেপ্তারের অভিযোগ; অনাহারে দিন কাটছে ১৬ পরিবারের
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ থানায় দায়ের করা অবৈধ পাথর উত্তোলন ও চুরির একটি মামলায় ১৬ জনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পুলিশের দায়ের করা এজাহারে দেখা যায়, ঘটনার সাথে ৪৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৫০/৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের পরিবারের দাবি, মূল হোতারা আড়ালে থাকলেও পুলিশ সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে সাধারণ শ্রমিক, দোকানের কর্মচারী এবং খেটে খাওয়া মানুষদের ‘বলির পাঁঠা’ বানাচ্ছে।কোম্পানীগঞ্জ থানার এসআই মো: কামরুল আলম বাদী হয়ে গত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে এই মামলাটি (এফআইআর নং-২৯) দায়ের করেন। এজাহারে দাবি করা হয়েছে, ওই দিন ভোর ৫:৪৫ মিনিটে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শাহ আরফিন টিলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের সময় আসামিদের ধাওয়া করা হয়। পরে সকাল ৬:০৫ মিনিটে বাবুলনগর এলাকার জনৈক আব্দুল কাইয়ুমের চায়ের দোকানের সামনে থেকে ৪টি পাথর বোঝাই মাহিন্দ্রা হাইড্রোলিক ট্রাক্টরসহ ১৬ জনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ আরও জানিয়েছে, অভিযানে প্রায় ৪০০ ঘনফুট পাথর উদ্ধার করা হয়েছে। মামলাটি খনি ও খনিজ সম্পদ আইন ১৯৯২ এবং দণ্ডবিধির ৩৭৯/৪৩১/৪১১ ধারায় নথিভুক্ত করা হয়েছে।এই মামলায় ৪৭ জনের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হলেও আরও ৫০/৬০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করায় এলাকায় ‘গণগ্রেপ্তার’ আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশের এই বিশাল তালিকার সুযোগ নিয়ে অনেক নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করার পথ প্রশস্ত হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত ১৬ জনের মধ্যে অনেকেই এলাকার অতি সাধারণ শ্রমিক। গ্রেফতারকৃতরা হল ১। মাহমুদুল (২১) পিতা বাছির,মাতা মনোয়ারা বেগম,২। সাকিবুল হাসান (১৯) পিতা ফসির উদ্দিন, মাতা রাহেলা বেগম, উভয় সাং খায়েরগাঁও, ৩। লালন (২০) পিতা মোঃ শামসুল হক,মাতা মোছাঃ সকিনা বেগম, সাং দক্ষিণ রাজনগর,থানা কোম্পানীগঞ্জ, জেলা সিলেট, ৪। আব্দুল্লাহ আল মামুন (২২) পিতা হাফিজ আশরাফ আলী, সাং বাবুল নগর, থানা কোম্পানীগঞ্জ, জেলা-সিলেট এবং তদন্তে প্রাপ্ত আসামী ৫।আল আমীন হোসেন (৩২) পিতা মৃত আব্দুল মুতালিব,মাতা মৃত আফছাড়া খাতুন,সাং ভোলাগঞ্জ,থানা কোম্পানীগঞ্জ,জেলা সিলেট,৬।ইয়াকুব আলী (৩৬) পিতা ইকরাম আলী, মাতা পিয়ারা বেগম,সাং চিকাডহর,কোম্পানীগঞ্জ, জেলা সিলেট,৭। কামরুল (২৫) পিতা আব্দুল খালিক,মাতা জয়তুন বেগম,সাং জালিয়ারপাড়, থানা-কোম্পানীগঞ্জ,সিলেট, ৮। আব্দুল করিম (২৭) পিতা মৃত আব্দুর রশিদ,মাতা আফতাবুর নেছা,সাং ধুপড়ীরপাড় খাগালী পাশা, কোম্পানীগঞ্জ,সিলেট, ৯।আবু বকর (২২)পিতা আব্দুল মালেক, মাতা রিনা বেগম,পাড়ুয়া মাঝপাড়া,কোম্পানীগঞ্জ,সিলেট, ১০। শফিক মিয়া (৪২)পিতা মৃত মঙ্গল মিয়া, মাতা সুর্যবান বেগম,সাং পাড়ুয়া মাঝপাড়া,কোম্পানীগঞ্জ, সিলেট ১১। রুহুল আমিন (৩০)পিতা মঙ্গল মিয়া মাতা সুর্যবান বেগম,পাড়ুয়া মাঝপাড়া কোম্পানীগঞ্জ,সিলেট,১২। কামরুজ্জামান (৩০), পিতা ময়না মিয়া, মাতা ফাতেমা বেগম, গ্রাম দক্ষিণ কালিবাড়ি, কোম্পানীগঞ্জ, জেলা সিলেট, ১৩। মোহাম্মদ লাল মিয়া (২৮), পিতা-মোঃ আব্দুল জব্বার, মাতা-আছিরুন্নেসা, গ্রাম-চিকাডহর, থানা কোম্পানীগঞ্জ, জেলা-সিলেট, ১৪। আখতার মিয়া (২৮), পিতা-ধনই মিয়া, মাতা রিনা বেগম, গ্রাম-পাড়ুয়া মাঝপাড়া, থানা-কোম্পানীগঞ্জ, জেলা-সিলেট, ১৫। শরিফ উদ্দিন (১৯), পিতা মোঃ আবু বক্কর, মাতা-হোসনে আরা বিবি, গ্রাম-পারুয়া উজানপাড়া, থানা-কোম্পানীগঞ্জ, জেলা-সিলেট, ১৬। সুলতান উদ্দিন (২২), পিতা-মোঃ আবু বক্কর, মাতা-হোসেনে আর বিবি, গ্রাম পারুয়া উজানপাড়া থানা-কোম্পানীগঞ্জ জেলা-সিলেট। গ্রেফতারকৃতরা বর্তমানে সিলেটে জেল হাজতে রয়েছেন।সংবাদমাধ্যমে গ্রেপ্তারকৃতদের পরিবারের সদস্যরা পুলিশের এজাহারের বর্ণনার সাথে বাস্তবতার ব্যাপক অমিল তুলে ধরেছেন।৮ নম্বর আসামি আব্দুল করিমের মালিক দাবি করেন, করিম এলসির চুনাপাথর ভাঙার ‘বিসমিল্লাহ মিনি স্টোন ক্রাশার’-এর ম্যানেজার। ঘটনার দিন রাত ১১টার সময় হোটেল থেকে ভাত খেয়ে ফেরার পথে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, অথচ এজাহারে তাঁকে ভোরবেলায় ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে।৪ নম্বর আসামি আব্দুল্লাহ আল মামুনের বাবা হাফিজ আশরাফ আলী বলেন, “আমার ছেলে রাতে ঘরে ঘুমাচ্ছিল। পুলিশ তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে নিয়ে গেছে।”১৪ নম্বর আসামি আখতার মিয়ার মা জানান, “ছেলেটা দোকানে পান খেতে গিয়েছিল, সেখান থেকেই পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়। তার নামে আগে কোনো মামলা ছিল না। ঘরে উপার্জনকারী ছেলেটি জেলে থাকায় আমরা এখন অনাহারে দিন কাটাচ্ছি।”অনুরূপ অভিযোগ ১২ নম্বর আসামি কামরুজ্জামানের স্ত্রীরও। তিনি জানান, তাঁর স্বামী জেসমিন ষ্টোন ক্রাশার মিলের গার্ড। ৭ বছরের মেয়ের জন্য রুটি কিনতে দোকানে গেলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তিন মেয়ে সন্তানকে নিয়ে তিনি এখন চরম বিপাকে পড়েছেন।ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে পুলিশ সাধারণ মানুষদের আসামি করে মামলা সাজিয়েছে। এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শফিকুল ইসলাম খান জানান, প্রকৃত অপরাধী ও আসামি গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলমান আছে। গ্রেপ্তারকৃতদের পরিবারের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “তদন্ত সাপেক্ষে চার্জশিট থেকে নির্দোষীদের নাম বাদ দেওয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দিনমজুর ও সাধারণ শ্রমিকদের এভাবে বিশাল মামলার জালে জড়ানো হলে আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হবে। তাঁরা দ্রুত এই ঘটনার সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে নির্দোষ ব্যক্তিদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।